জনমনে বেতন বৃদ্ধি নিয়ে স্বস্তি ও শঙ্কার মিশ্র সুর


মোস্তাফিজুর রহমান প্রকাশের সময় : জুন ১২, ২০২৬, ১১:৫১ অপরাহ্ণ
জনমনে বেতন বৃদ্ধি নিয়ে স্বস্তি ও শঙ্কার মিশ্র সুর

 

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে ১ জুলাই থেকে। তবে এই সিদ্ধান্তে যেমন স্বস্তির প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনি রয়েছে প্রশ্ন ও শঙ্কাও। কেউ বলছেন, বাড়তি বেতন দুর্নীতি ও অনিয়ম কমাতে সহায়ক হতে পারে; আবার কেউ আশঙ্কা করছেন, জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এটি হবে ‘বালতির তলায় ছিদ্র রেখে পানি ঢালার’ মতোই এক ব্যর্থ উদ্যোগ।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের (প্রস্তাবিত) বাজেট পেশকালে অর্থবছর শুরু থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আজ শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর বিভিন্ন সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া যায়।

মালিবাগ মোড়ে কথা হয় হাশিম মোল্লার সঙ্গে। তিনি স্থানীয় একটি কাপড়ের দোকানের কর্মী। দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে গোলবাগ এলাকায় থাকেন। তার বাড়ি ময়মনসিংহ গফরগাঁওয়ে। ‎তিনি বলেন, ‘শুনতাছি সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়তাছে। এতে করে আমাগো ওপর চাপও বাড়তাছে।’

১৪ বছরের বেশি সময় ধরে সেলসম্যান হিসেবে কাজ করছেন তিনি। বর্তমানে ২৬ হাজার টাকা বেতন পান। ‎হাশিম মোল্লা বলেন, ‘এই (টাকা) দিয়া জীবন চলে না। বাজারে সবকিছুর দাম বাড়তি। বাজারেই সব টাকা চলে যায়। জমানোর কোনো সুযোগ নাই। পোলাটা স্কুলে পড়ে। মাইয়াটারেও আগামী বছর স্কুলে ভর্তি করা লাগবো। অনেক খরচ। কিন্তু আমাগো ওপর চাপ বাড়তাছেই।’

‎একই এলাকায় কথা হলে বেসরকারি চাকরিজীবী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘বেতন বৃদ্ধি থেকে বেশি দরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামের লাগাম টানা। তাহলে বেতন বৃদ্ধির কোনো দরকার পড়বে না। কিন্তু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে বাকি সবার ওপরই চাপ তৈরি হবে।’

শান্তবাগ এলাকায় চর্বি সংগ্রহ করছিলেন মইজুদ্দিন। কথা হলে তিনি বলেন, ‘এই নিয়া (সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো) কথা বইলা লাভ নাই। আমাগো কাম করতে হবে, তাহলে সংসার চলবো।’

‎দিদারুল ইসলাম নামের আরেকজন বলেন, ‘সমাজের কোনো একটা গ্রুপের বেতন ভাতা বৃদ্ধি বাকি বড় অংশের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াবে, এটা অন্যায়।’

‎তবে মগবাজার এলাকার বাসিন্দা তাজুল ইসলাম অবশ্য যৌক্তিক বেতন বাড়ানোর পক্ষে। সরকারি চাকরিজীবীদের ঘুষ-দুর্নীতি রোধ করার কথাও বলেছেন তিনি।

‎তাজুল ইসলাম বলেন, ‘এক হালি কলার দাম চাইল ৬০ টাকা। দুই হালি ১০০ টাকা বলেছি, দেয়নি। সবধরনের জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। যৌক্তিক বেতন বাড়ানোর দরকার। তবে তাদের (সরকারি চাকরিজীবীদের) ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’

‎জয়নাল আবেদিন নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, দুর্নীতি অনিয়ম দেখলেই বরখাস্ত করতে হবে।’ ‎তিনি বলেন, ‘এখন বেতন বাড়ানোর পরও যদি ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ না হয় তাহলে কোনো লাভ হবে না। এতে তাদের (সরকারি চাকরিজীবীদের) বেতনের বুঝা আমাদেরই বইতে হবে।’‎

‎মোশারফ হোসেন নামের এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী বলেন, ‘সরকারের দুর্নীতি বন্ধ এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ইচ্ছা থাকলে সর্বনিম্ন বেতন ৫০ হাজার হলেও সমস্যা নাই।’

‎শান্তিনগর মোড়ের একটি প্রতিষ্ঠানে ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে কাজ করেন মাহমুদ। ‎তিনি বলেন, ‘সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন দরকার হলে ২-২.৫ গুণ করেন সমস্যা নাই। কিন্তু কোনোরকম দুর্নীতি ছাড় দেওয়া যাবে না।’

তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর তাদের সম্পদের হিসাব নিতে হবে, একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ দুর্নীতির প্রমাণ পেলে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বাতিলসহ ‎তাকে ১০-১৫ বছরের জেলের ব্যবস্থা করতে হবে। আর নয়ত বেতন বাড়ালেও কোনো কাজে আসবে না।’

‎তিনি আরও বলেন, ‘দুর্নীতি রেখে যতই বেতন বাড়ান তাতে লাভ নাই, দিনশেষে সবকিছু প্রায় শূন্য এর মতন হবে। বালতির তলায় ফুটা রেখে সারাদিন পানি ঢালার মতন অবস্থা হবে!’

আশিকুর রহমান নামের এক বেসরকারি চাকরিজীবী অবশ্য বলেন, দুর্নীতি রোগের ওষুধ বেতন বাড়ানো নয়। ‎এনবিআরের মতিউর বা পুলিশের বেনজীরের দুর্নীতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘তারা কিন্তু অর্থকষ্টে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন-এটা ঠিক না। এ বিষয়গুলো নতুন সরকারকে নজর দিতে হবে।’

‎আশিকুর রহমান আরও বলেন, ‘মানুষের খরচ যেভাবে বেড়েছে, শুধু সরকারি চাকরিজীবীই নয়, অন্যান্য বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদেরও যৌক্তিক বেতন কাঠামোয় আনার জন্য মনোযোগ দিতে হবে সরকারকে।’

‎২০১৩ সালে অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের পর দীর্ঘ ১২ বছর পরে নতুন বেতন কমিশন গঠিত গঠন হয়। পরে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ২০ দিন আগে সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করে নবম জাতীয় বেতন কমিশন।

‎বেতন কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ বরাদ্দ করে যাওয়ার কথাও বলেন তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। নির্বাচনের পর সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, পশ্চিম এশিয়া যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে নতুন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে পারেনি বিএনপি সরকার। ‎তবে নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনায় গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি তিন ধাপে বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করে।

‎গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

নতুন বাজেট পেশকালে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারি কর্মচারীরা বিগত প্রায় ১১ বছর যাবৎ একই বেতন কাঠামোতে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতিজনিত কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আগামী ১ জুলাই ২০২৬ হতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিচ্ছি।

‎সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ২০২৬-২৭ অর্থবছর নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হবে। পরের অর্থবছরে বাকি ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হবে। তৃতীয় বা সবশেষ ধাপে (২০২৮-২৯ অর্থবছরে) মূল বেতনের সঙ্গে বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পুরোপুরি সমন্বয় করা হবে।

‎জানা গেছে, বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের বার্ষিক ব্যয় হচ্ছে এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। এখন নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে এক লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০