
পদ্মা সেতুর দক্ষিণপ্রান্তে শরীয়তপুরের নাওডোবা এলাকায় মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে বেপরোয়া চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঢাকার টেম্পু স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণকারী প্রভাবশালী চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট ”চাপাতি সামচুর” উত্তরসুরীরা এই চাঁদাবাজি করছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রতি মাসে প্রায় অর্ধ-কোটি টাকা চাঁদা আদায় করছে এই সিন্ডিকেট।
জানা গেছে, পদ্মা সেতু পার হয়ে রাজধানী ঢাকার সাথে খুলনা, বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বাগেরহাটসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় ২১ জেলার মানুষের যাতায়াত এই রুটে। প্রতিদিন এই রুটে দেশের খ্যাতনামা কোম্পানী স্বাধীন পরিবহন, বসুমতি পরিবহন, প্রচেষ্টা পরিবহন, মাওয়া ইলিশ পরিবহন, ইলিশ স্পেশাল, আনন্দ পরিবহন, নড়াইল এক্সপ্রেস, নড়াইল স্টার, বরিশাল এক্সপ্রেস, পালকী পরিবহনসহ প্রায় অর্ধশত কোম্পানীর সহস্রাধিক যাত্রীবাহী বাস যাতায়াত করে। আনন্দ এক্সপ্রেস পরিবহনের ফিল্ড সুপারভাইজার মো. সাহেন, বসুমতি ট্রান্সপোর্ট লি: এর সুপারভাইজার মো. বিল্লাল হোসেনসহ স্থানীয় লোকজন এবং সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে কয়েকধাপে আদায় করা হচ্ছে চাঁদা। এর মধ্যে বাসের ট্রিপ নিয়ন্ত্রণ বা বিশেষ সুবিধার নামে প্রচলিত একটি পদ্ধতিকে ‘জিপি’ (গেটলক পাস) বলা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিবার স্ট্যান্ড অতিক্রমের সময় প্রতিটি বাস থেকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া মাঠপর্যায়ে ওই সিন্ডিকেটের নিয়োজিত শ্রমিকরা বরিশাল ও খুলনা অঞ্চল থেকে ঢাকাগামী বাসে যাত্রী গণনা করে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত চালক ও হেলপারদের কাছ থেকে আদায় করছেন। এতে প্রতি মাসে প্রায় অর্ধ-কোটি টাকা চাঁদা আদায় হচ্ছে বলে স্থানীয়রা ধারণা করেছেন। আনন্দ এক্সপ্রেস পরিবহনের ফিল্ড সুপারভাইজার মো. সাহেনসহ স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মহাসড়কের উপর জমাদ্দার বাস-স্ট্যান্ড, ঢাকা বাস-স্ট্যান্ড এবং ঢাকা লোকাল বাস-স্ট্যান্ড নামে তিনটি ভাগে চাঁদা তুলছে সিন্ডিকেটের নিযুক্ত শ্রমিকরা। এরমধ্যে জমাদ্দার বাস-স্ট্যান্ডে বরিশালের সবুজ, কাঠালবাড়ির ঠান্ডু, জিহাদ ঢালী, জাহিদ ঢালী, পশ্চিম নাওডোবার রিয়াদ, সুমন, লাবলু, মল্লিক কান্দির বেলায়েত, আরব আলী ও রায়হান, ঢাকা বাস-স্ট্যান্ডে নাসির, গোমস্তাকান্দির রায়হান, কাঠালবাড়ির সাগর, জুয়েল হাওলাদার ও পলাশ বেপারী এবং ঢাকা লোকাল বাস-স্ট্যান্ডে মিজানুর রহমান বাবু চৌধুরী, অপু বেপারী, বাচ্চু বেপারী, শাহ আলম, শাওন, রনি বেপারী ও দিপু বেপারী চাঁদা তুলছেন।
বুধবার দুপুরে সরেজমিন গিয়ে স্থানীয় এবং একাধিক পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘বাবু-অপু সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত সংঘবদ্ধ চক্রটি চাঁদাবাজির সাথে জড়িত রয়েছে। ফলে পরিবহন মালিক, চালক, হেলপার ও বাসের যাত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
নাওডোবা ইউনিয়ন বিএনপি’র সাবেক সভাপতি মো. রোকন ঢালী, ওই ইউনিয়ন বিএনপির বর্তমান সভাপতি আলমগীর সরদার, সাধারণ সম্পাদক ইদ্রিস ঢালীসহ অনেকে বলেন, ”এই রুটে প্রায় ৫০টি কোম্পানীর বাস চলাচল করছে। যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আমরা পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার ওসি এবং শরীয়তপুর পুলিশ সুপারকে অবহিত করেছিলাম। কিন্তু এখনো চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি।
তারা আরও বলেন, যারা চাঁদাবাজি করছে তারা বিএনপির কোন লোক নয়। জাজিরা উপজেলার নাওডোবা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলমগীর সরদার বলেন, ” মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে যারা চাঁদা আদায় করছে, তাদেরকে ধরা উচিত।”
‘বাবু-অপু সিন্ডিকেট’ এর কে এই বাবু-অপু?
স্থানীয়রা জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে টেম্পু স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ করতেন সামচুল হক বেপারী ওরফে চাপাতি সামচু। তিনি পুরান ঢাকা আওয়ামী লীগ নেতা প্রভাবশালী সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ঢাকার টেম্পু স্ট্যান্ডসহ বিভিণ্নস্থানে চাঁদাবাজি ও নানা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাতেন। চাপাতি সামছুর পৈত্রিক বাড়ি শরীয়তপুরে জাজিরা উপজেলার নাওডোবা কালু বেপারীকান্দি গ্রামে। সরকার পরিবর্তনের আগে চাপাতি সামছু মারা গেলে এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আসেন তার তিন মেয়ে জামাই অপু বেপারী, কামাল বেপারী, মিজানুর রহমান বাবু চৌধুরী এবং ছেলে রনি বেপারী। এর মধ্যে অপু বেপারী ও কামাল বেপারী দুজন আপন ভাই।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সরকার পরিবর্তনের পূর্বে তারা আওয়ামী লীগ দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তাদের বাড়ি নাওডোবা কালু বেপারীকন্দি গ্রামে। কামাল বেপারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নি সংযোগ এবং ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর তারিখে পদ্মা সেতু এলাকায় আওয়ামী লীগের ব্যানারে মিছিল ও পুলিশের উপর হামলা মামলায় সম্প্রতি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে শরীয়তপুর জেলা কারাগারে রয়েছেন। আর মিজানুর রহমান বাবু চৌধুরীর বাড়ি নোয়াখালী জেলায়। তিনি স্থানীয় অপু ব্যাপারীর ভায়রা। অভিযোগ রয়েছে, একসময় তিনি ঢাকার বাড্ডা এলাকায় যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর শ্বশুরবাড়ি শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবা এলাকায় এসে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রভাব খাঁটিয়ে চাঁদাবাজির একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ওই সিন্ডিকেটের কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, গত বছরের ৫ আগস্টের আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনাতেও এই চক্রের কয়েকজন সদস্য জড়িত ছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তারা নতুন পরিচয়ে একই এলাকায় চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাস মালিক বলেন, “আমরা যদি চাঁদা না দেই, তাহলে আমাদের বাস ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকলেও স্থানীয়রা যাত্রী তুলতে দেয় না। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েই টাকা দিতে হচ্ছে।” আরেক স্থানীয় ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বাবু-অপু সিন্ডিকেটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে পরিবহন খাতে অনিয়ম বিশৃঙ্খলা চলছে। আমরা এই সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্তি চাই।”
এ বিষয়ে জানতে অপু বেপারীকে মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত মিজানুর রহমান বাবু চৌধুরী।
তিনি বলেন, “চাঁদাবাজির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমি পাঁচটি বাসের মালিক এবং কয়েকটি বাসের রোড সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। নির্বাচনের আগেই প্রায় ৬০০ লোক নিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছি। ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের লোকজন জোর করে আমাদের হাতে তৎকালীন সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন অপুর পোস্টার ধরিয়ে ছবি তুলেছিল। আমি আগে থেকেই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।”
মহাসড়কে চাঁদাবাজির বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে শরীয়তপুরের নাওডোবা নিবাসী কৃষকদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক মিন্টু সওদাগর বলেন, ”বিএনপি কোন সময় চাঁদাবাজির রাজনীতি করে না। যারা মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস থেকে চাঁদাবাজি করছে তারা বিএনপির কেউ না।”
পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার ওসি আব্দুস সালাম মিয়া বলেন, “ নাওডোবায় মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে চাঁদাবাজি করছে, এ বিষয়গুলো আমাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে। এগুলো নিয়ে আমরা তদন্ত করছি। কাউকেই চাঁদাবাজি করতে দেয়া হবে না।
এ বিষয়ে জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল ইমরান বলেন, “চাঁদাবাজির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।”
SK24
আপনার মতামত লিখুন :