মহেশপুর পৌরসভায় মেগা প্রকল্পে হরিলুট, বিলে সই না করায় প্রকৌশলীর কক্ষে তালা!


ফিরোজ আহম্মেদ, ঝিনাইদহ প্রকাশের সময় : জুলাই ২, ২০২৬, ৮:১৮ অপরাহ্ণ
মহেশপুর পৌরসভায় মেগা প্রকল্পে হরিলুট, বিলে সই না করায় প্রকৌশলীর কক্ষে তালা!
মহেশপুর পৌরসভায় ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে চলমান নগর সুশাসন ও অবকাঠামো উন্নয়ন মেগা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। টেন্ডার শিডিউল অমান্য করে নিম্নমানের কাজ করা সত্ত্বেও ঠিকাদারদের বিল পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে খোদ নির্বাহী প্রকৌশলী সোহেল রানার বিরুদ্ধে। টিআর প্রকল্পেও হয়েছে যথেচ্ছা লুটপাট। দুর্নীতির এমন কিছু বিলে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানানোয় মহেশপুর পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী সোহেল রানা তাঁর কার্যালয়ের নকশাকার তরিকুল ইসলামের সহায়তায় এই অনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দুপুরে উপ-সহকারী প্রকৌশলীর কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার পর অফিস সময় শেষ হওয়া পর্যন্ত তা খোলা হয়নি। ফলে দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে শেষে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হন ভুক্তভোগী উপ-সহকারী প্রকৌশলী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে পৌর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৪২ কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পের আওতায় আরসিসি ড্রেন নির্মাণ, রাস্তা কার্পেটিং ও বাজারের রাস্তা আরসিসি করণের কাজ চলছে। নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রত্যক্ষ ইন্ধনে ঠিকাদারেরা অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে বিল তুলে নিচ্ছেন। প্রতিটি বিল ছাড়ানোর জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী ২% হারে কমিশন বা ঘুষ নিচ্ছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় আরসিসি ড্রেন নির্মাণে বরাদ্দের চেয়ে অনেক কম রড ব্যবহার করা হয়েছে।
এছাড়া টিআর প্রকল্পের আওতায় তিনটি ডাস্টবিন নির্মাণের কথা থাকলেও মাত্র একটি নির্মাণ করে পুরো টাকা উত্তোলন করে নেওয়া হয়েছে। বাজারদরে মাত্র ৫ হাজার টাকার হ্যালোজেন বাতি কেনা দেখানো হয়েছে ২০ হাজার টাকা করে। শহরজুড়ে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা লাগানোর কথা থাকলেও বসানো হয়েছে মাত্র ৫-৬টি এবং সচেতনতামূলক কোনো বিলবোর্ডও স্থাপন করা হয়নি। অথচ ৩০ জুনের ডেডলাইনের আগেই টিআর প্রকল্পের সমুদয় টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। দুর্নীতির এখানেই শেষ নয়, জলবায়ু প্রকল্পের আওতায় পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় সোলার বাতি স্থাপনের নামে ৬ কোটি টাকারও বেশি অর্থ লোপাট করা হয়েছে। সেখানে অত্যন্ত কম মূল্যের নি¤œমানের সোলার প্যানেল বসিয়ে চড়া মূল্যের বিল পাস করানো হয়েছে।
এছাড়া পৌরসভার সামনের একটি সড়ক ও বাজারের টেন্ডার হওয়া রাস্তা একাধিকবার মেরামত দেখিয়ে ভুয়া বিলের মাধ্যমে প্রায় অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। পৌরসভার কর (ট্যাক্স) বাবদ সংগৃহীত টাকা মূল ফান্ডে জমা না করে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হচ্ছে।
পাকা ভবন নির্মাণের নকশা যাচাইয়ের জন্য কোনো কনসালটেন্ট ফার্মের তোয়াক্কা না করে, পৌরসভার নকশাকারকে দিয়ে অবৈধ সিল-স্বাক্ষর করিয়ে লাখ লাখ টাকা পকেটে ভরছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব ভুয়া মেমো, ভাউচার ও দুর্নীতির বিলে উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষর করতে রাজি না হওয়াতেই ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেন নির্বাহী প্রকৌশলী।
কক্ষে তালা লাগানোর বিষয়ে জানতে চাইলে মহেশপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী সোহেল রানা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে মহেশপুর পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সাজ্জাদ হোসেন বলেন, সরকারি অফিসে তালা লাগানোর বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। পরীক্ষার ডিউটিতে ব্যস্ত থাকায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে না পারলেও খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। উপ-সহকারী প্রকৌশলীর রুমে তালা লাগানোর বিষয়ে দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং প্রয়োজনে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানানো হবে।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপ-পরিচালক রথীন্দ্রনাথ রায় জানান, মহেশপুর পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলীর কক্ষে তালা মারার ঘটনায় পৌরসভার প্রশাসকের কাছে পুরো ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে পেলেই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০৩১