স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কালীগঞ্জ পৌর এলাকার পাশাপাশি কাশিপুর, চাচড়া, শিবনগর, আড়পাড়া, নদী-আড়পাড়া, ঢাকালে পাড়া, বলিদাপাড়া, সিংঙ্গী, রায়গ্রাম, দুলালবন্দিয়া, ফয়লা, হেলাই, মাস্টারপাড়া, পাইকপাড়া, চাপালী, শ্রীরামপুর, আনন্দবাগ, খয়েরতলা, বাকুলিয়া, ভাটপাড়া, মহাদেবপুর ও আলাইপুরসহ আশপাশের বহু এলাকায় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বারোবাজারের মঙ্গলপৈতা, সোনালী ডাঙ্গার মোড়, বারফা ব্রিজ এলাকা, মাজদিয়া বাউড়ের বড় ব্রিজ, বাদুরগাছা মাজার সংলগ্ন এলাকা, মিঠাপুকুর মোল্লাপাড়া, মহিষাহাটি-বাদুরগাছা সড়ক, রাখালগাছি, জাহাজমারির ঘাট, ধোপাদি বাজার, কাষ্ঠভাঙ্গা, সাঁক বাজার ও সাদিকপুরসহ বিভিন্ন স্থানে মাদক ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলেছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব স্থানের অনেকগুলোই অতীতেও মাদক ব্যবসার জন্য পরিচিত ছিল। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কিছু জনপ্রতিনিধির ছত্রচ্ছায়ায় এই অবৈধ ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাদক ব্যবসায়ীরা শুধু বিক্রিই করছে না, বরং বাইরের জেলা থেকে আসা মাদকসেবীদের জন্যও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করছে। অনেক তরুণ পাশের জেলা থেকে এসে এখানে মাদক সেবন করে নির্বিঘেœ ফিরে যাচ্ছে। ফলে কালীগঞ্জ ধীরে ধীরে আঞ্চলিক মাদককেন্দ্রে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
র্যাব, জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), থানা পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও মাদকচক্রের দৌরাত্ম্য কমছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। মাঝেমধ্যে মাদকসহ ব্যবসায়ীরা গ্রেপ্তার হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে বলে দাবি তাদের। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি অভিযানের পরও মাদক ব্যবসা আগের মতো চলতে থাকে, তাহলে এর স্থায়ী সমাধান কোথায়?
স্থানীয় সাংবাদিক ও ব্যবসায়ী আনোয়রুল ইসলাম রবি বলেন, আগের দিনের শান্ত গ্রামগুলো আজ নেশার অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে। যে তরুণদের চোখে ছিল স্বপ্ন, আজ তাদের অনেকের চোখে শুধু নেশার ঘোর। মাদক মানুষের ভেতরের শক্তি, বিবেক ও ভবিষ্যৎ, সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। তিনি আরও বলেন, মাদক এখন শুধু দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং সচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারের সন্তানরাও দ্রæত এর শিকার হচ্ছে।
স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাদকের কারণে পরিবারে অশান্তি, সামাজিক অবক্ষয়, মানসিক বিপর্যয় এবং অপরাধপ্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক জানান, বর্তমানে ১২-১৩ বছর বয়সী কিশোরদের মধ্যেও মাদকাসক্তির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাদের ভাষায়, একসময় ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা আর পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকত। এখন অনেকেই ইয়াবা ও ফেনসিডিলের দিকে ঝুঁকছে। সন্ধ্যার পর সস্তানকে বাইরে পাঠাতে ভয় লাগে।
তাদের অভিযোগ, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কথা বললে নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়। ফলে অনেকেই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। গ্রামাঞ্চলে মাদকের বাজার আরও বিস্তৃত হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, গ্রামে মাদকের চাহিদা বেশি, ভয় কম। ফলে বিক্রেতারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
কালীগঞ্জ থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জেল্লাল হোসেন বলেন, উপজেলাকে মাদকমুক্ত করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং মাদক ব্যবসায়ী কিংবা সেবনকারী, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। পুলিশের দাবি, মাদকচক্র নির্মূলে স্থানীয় জনগণের তথ্য ও সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে।
তবে এলাকাবাসীর দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের দৃশ্যমান তৎপরতা আগের তুলনায় কমেছে। এছাড়া থানা পুলিশের কয়েকজন এএসআই ও এইআই এর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন তারা। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শেখ মোহাম্মদ হাসেম আলী জানান, সত্য বলতে মাদক কারবারির সংখ্যা বেড়েছে সাথে সাথে মামলার সংখ্যা বেড়েছে। নিয়মিত অভিযান চলছে। মাদকের সাথে কোন আপোষ নয়।
এক সময় সংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও সামাজিক শান্তির জন্য পরিচিত কালীগঞ্জ আজ মাদকের ভয়াল থাবায় ক্ষতবিক্ষত বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, যুবসমাজের ভবিষ্যৎ, পরিবারের স্থিতি এবং সমাজের নিরাপত্তা, সবকিছুই এখন হুমকির মুখে। মাদকের বিরুদ্ধে এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক কঠোরতা এবং সামাজিক প্রতিরোধের সমন্বিত উদ্যোগ। অন্যথায় আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।