বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’ প্রাচীনতম বৃহৎ সংগঠন। বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে এর সম্পর্ক জড়িয়ে রয়েছে। মহান ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মতো ঐতিহাসিক অধ্যায়গুলোতে এই সংগঠনের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা অনস্বীকার্য। স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও ছাত্রলীগ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু নব্বইয়ের দশক পরবর্তী সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ঠিক কতটুকু ‘ছাত্রলীগ’ হয়ে ছিল, তা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা দুই-ই হতে পারে। তবে সমালোচনাই বেশি দৃশ্যমান। এর বাইরে সবচেয়ে অনালোচিত অধ্যায়টি হচ্ছে ছাত্রলীগের নিপীড়িত হওয়ার ইতিহাস। দেশ ও দেশের মানুষের জন্য ছাত্রলীগের যে ত্যাগ রয়েছে, ইতিহাসে আজও তা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি। ন্যায় বিচার পায়নি অগণিত নির্যাতিত, নিপীড়িত ও হত্যার শিকার নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। এ নিয়ে দলের শীর্ষস্থানীয়দের নিরবতাও মাঝে-মধ্যে উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে তুলেছিল। সব ছাপিয়ে আজ ‘ছাত্রলীগ’ যে প্রেক্ষাপটের মুখোমুখি হয়েছে, তাতে নতুন করে ভাববার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। ‘মজলুম’ হিসেবে ছাত্রলীগের ঐতিহাসিকতাকে সামনে আনার দাবিটাও সময়েরই প্রয়োজন।
স্বাধীনতোত্তর বাংলাদেশে বিশেষভাবে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ছাত্ররাজনীতির গতিপ্রকৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। নিঃসন্দেহে এটার একটা প্রভাব বৃহৎ ছাত্র সংগঠন হিসেবে তাদের ওপর পড়েছে। বিচারহীনতার দায়ও সেসব প্রেক্ষাপটেও ক্ষাণিকটা বর্তায়। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বিভিন্ন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সংঘাতসহ নানা কারণে ছাত্রলীগের অসংখ্য নেতাকর্মী হত্যা ও নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মাঝে ‘অভ্যন্তরীণ কোন্দল’ ও ‘বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি’র সঙ্গে সংঘাত বা সংঘর্ষের অন্দর মহলটা বেশ ধোঁয়াসাচ্ছন্ন। দলে ঘাপটি মেরে থাকা ‘গুপ্ত’রাই এসবে ক্রিয়াশীল ছিল, তা ইদানিংকালে প্রকাশ্যে এসেছে।
আওয়ামী লীগ শাসনের ১৭ বছরে ছাত্রলীগকে কেন্দ্র করে সংগঠিত ঘটনাপ্রবাহ, বিশেষত ‘জুলাই’ ইস্যুতে যে ‘নেতিবাচক ইমেজ’ তৈরি করা হয়েছে, তা স্বল্প সময়ের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। বরং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়েই বিরোধী পক্ষগুলো অভ্যন্তরীণভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। বহু বছর আগেই দলে উপদলে নানা গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ছাত্রলীগে তারা অনুপ্রবেশ করতে শুরু করে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার অভাব ও যথাযথ বাছাই পর্ব না থাকায় এই অনুপ্রবেশ প্রক্রিয়া কোনো বাধার মুখোমুখি হয়নি। বরং পাকিস্তান আমল পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে এসে ছাত্রলীগকে ঘিরে ষড়যন্ত্র সহজভাবেই আরও প্রকট হয়ে উঠেছিল। এসব জানতে বা বুঝতে সচেষ্ট হননি দলের নীতিনির্ধারকগণ। এজন্য অবশ্য আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ পুঁজিবাদি শ্রেণির আধিপত্য ও ব্যবসায়িক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর দায়টা বেশি। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে ছাত্রলীগকে ব্যবহারের প্রবণতা এই ‘গুপ্ত সাম্রাজ্য’ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছে। এর মধ্য দিয়ে ‘ছাত্র-জনতা’র বিপরীতে ‘ছাত্রলীগ’কে খুব দ্রুত সময়ের ভেতর দাঁড় করানো সম্ভব হয়েছিল।
গণশত্রুতে রূপান্তরিত করার পরিবেশ পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় আওয়ামী বিরোধী শক্তিগুলো ছাত্রলীগকে হত্যাযোগ্য করতে সচেষ্ট হয়েছে। তথাকথিত সুশীলগণ দীর্ঘদিন থেকে ‘শিবির’কে হত্যাযোগ্য করার যে বয়ান সামনে এনেছিল, তার পেছনে মূলত ছিল এর দায় লীগের উপর বর্তিয়ে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের নির্মূলের সম্মোহন উৎপাদন করা। এই প্রকল্প বহুমুখী বিস্তৃতপন্থায় অগ্রসরমান ছিল। ফলে, আওয়ামী লীগের ক্ষমতাসীন সময় থেকেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ওপর যে সহিংসতাগুলো ঘটেছে, তা নিয়ে জোরালো আলোচনা লক্ষ্য করা যায়নি। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষার্থীদের জীবনে মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। যা দেশের ছাত্ররাজনীতির সুস্থ ধারাকে যেমন ব্যাহত করছে, তেমনি দেশের মানবিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছে। এই মাত্রাকে এক ধরণের বৈধতা দিয়েছে বিরোধী পক্ষের তথাকথিত ‘নিষিদ্ধ’করণের রাজনীতি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গত কয়েক দশক থেকে ছাত্র সংগঠনগুলোকে ‘পেশী শক্তি’ হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। অধিকাংশসময়ই ছাত্র সংগঠনগুলোকে মূল দলগুলোর লাঠিয়াল বা অগ্রবর্তী বাহিনী হিসেবে ব্যবহৃত করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রলীগও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ফলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পাসগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ বদল হওয়ায় বদল হয়েছে ছাত্র নেতৃত্বেও। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছাত্র রাজনীতি। এর সবচেয়ে বড়ো ভুক্তভোগী সংগঠন ‘ছাত্রলীগ’। পাকিস্তান শাসনামলে ছাত্রলীগের নিপীড়িত হওয়ার চিত্র, স্বাধীন বাংলাদেশে এসেও ঐ একই ইতিহাস ছাত্রলীগের জন্য সুখকর নয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে পরাজিত শক্তিগুলো গুপ্ত থেকে ভিন্নরূপে আওয়ামী বিরোধীতায় নামে, পক্ষান্তরে বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতা পুনরায় শুরু হয়। পেন্টাগন কমিউনিস্টদের তথাকথিত ‘প্রতিবিপ্লব’র হাত ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু হওয়ার সময়পর্বে থেকেই একাত্তরের পরাজিত পক্ষগুলো জাসদসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীতে অনুপ্রবেশ শুরু করে। তেমনি উদ্ভূত পরিস্থিতিকে প্রতিশোধের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে থাকে তারা। ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এবং সরকারের ‘বুর্জোয়া’ নীতির বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের ‘বিভ্রান্তীকর’ অবৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। সেসময়েই আবারও ‘ছাত্রলীগ’ পাকিস্তানভাবধারায় প্রতিপক্ষের প্রতিহিংসার শিকার হতে শুরু করে।
জাসদ, জাসদের গণবাহিনী, পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি, পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) সহ অন্যান্য মাওবাদী গোষ্ঠীর অপতৎপরতার প্রচ্ছন্ন ছায়াতলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্র সংঘ (শিবির), মুসলিম লীগ এবং নেজামে ইসলামীর মতো দক্ষিণপন্থী দলগুলোও আন্ডারগ্রাউন্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠে। আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে নানামুখী অপপ্রচার-প্রচারণা এবং অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকা এসব দল আওয়ামী লীগকে ‘শ্রেণি শত্রু’ হিসেবে আখ্যা দেয় এবং ‘হত্যাযোগ্য’ ঘোষণা করে।
এই তথাকথিত ‘বিপ্লব’র সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত ইসলামপন্থী সাম্প্রদায়িক দলগুলোর ‘জিহাদ’র খুব একটা তফাৎ নেই। এদের লক্ষ্যই ছিল বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী ধারাকে উৎখাত করা। এই উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নিধনে তারা একই প্রান্তে অদৃশ্য ঐক্য গড়ে তুলেছিল। এই ঐক্যে আরেকটি প্রচারণা জোর হাওয়া লাগিয়েছে, ছাত্রলীগ ‘ছাত্র ইউনিয়ন’ বিরোধী বয়ান। বলা হয়ে থাকে, মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘ছাত্রলীগ’ ‘ছাত্র ইউনিয়ন’র মুক্তিযোদ্ধাদের মেনে নিতে পারেনি। তারা ইউনিয়নের যোদ্ধাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে হত্যা করেছে। সিপিবি বা ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ইতিহাসের এই ন্যারেটিভের পক্ষে তেমন অবস্থান না থাকলেও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চীনাপন্থী কমিউনিস্টরা এই বয়ান বাজারে ছাড়তে বেশ সফলই হয়েছিল। এমন প্রচারণা সাম্প্রতিককালেও নতুন করে শোনা যাচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবেই এসব ঘটনাপ্রবাহ ও প্রচারণা সেসময় পর্ব থেকে অদ্যাবধি আওয়ামী লীগের প্রাণশক্তি ‘ছাত্রলীগ’কে প্রতিহত করার প্রবণতাকে তীব্রতর করে তুলেছে। ফলে, সবসময়ই ‘ছাত্রলীগ’ হয়ে উঠেছে মূল টার্গেট।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশজুড়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ওপর নেমে আসে চরম নির্যাতন। সামরিক শাসন আমলে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রলীগ তীব্র দমন-পীড়নের মুখোমুখি হয়। জিয়াউর রহমানের শাসনামলজুড়ে ছাত্রলীগ এক শোচনীয় জীবন পার করে। নব্বইয়ের দশকের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে (২০০১-২০০৬) ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ওপর দেশব্যাপী পদ্ধতিগত নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা ঘটতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের ক্যাডারদের হাতে ছাত্রলীগের বহু নেতাকর্মীকে নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হয়। অনেককে রগ কেটে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো নৃশংস নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। এইসব ঘটনার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান আজও তৈরি হয়নি। তেমন কোনো বিচারও লক্ষ্য করা যায়নি।
আওয়ামী লীগ নানা সময়ে ক্ষমতায় এলেও, এসব ঘটনায় কেন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সচেষ্ট হয়নি, তার উত্তর মেলা ভার। ব্যর্থতা নাকি সদিচ্ছার অভাব তাও বলা কঠিন। তবে, অনেক ক্ষেত্রেই এসব ঘটনায় আওয়ামী লীগ সরকারকে যখনই কোনো উদ্যোগ নিতে আমরা দেখেছি, সেসময়ই কতিপয় সুশীল ও এনজিওবাদী গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব বিচার পদক্ষেপকে ‘বিরোধী মত-পথ ও লোকজন’ দমনের হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ছাত্রলীগের ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার পেছনে এ-এক কারণ এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংকটও বাঁধা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে!
ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হত্যার পেছনে কেবল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সহিংসতাই একমাত্র দায়ী, সবক্ষেত্রে এমনটা নয়। একটি অংশজুড়ে রয়েছে নিজস্ব রাজনৈতিক কোন্দল। বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকাকালীন ছাত্রলীগের মধ্যে হল দখল, সিট বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি এবং ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অসংখ্য উপদল বা ‘গ্রুপ’ তৈরি হয়েছিল। এই গ্রুপগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্বে বহু সাধারণ কর্মী ও উদীয়মান নেতা প্রাণ হারিয়েছেন। নানা সময়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ছাত্রলীগের কর্মীদের নিজেদের ভাইদের হাতেই খুন হতে দেখা গেছে। পদ-পদবি না পাওয়া, জুনিয়র-সিনিয়র দ্বন্দ কিংবা বড়ো ভাইদের লেজুড়বৃত্তির কারণে অনেক মেধাবী ছাত্রের জীবন প্রদীপ অকালেই নিভে গেছে, যা সংগঠনের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে।
তবে, এসব ঘটনাকে বর্তমান ‘জুলাই পরিবর্তিত’ পরিস্থিতি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করার পথ খুলে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ শাসনামলে ছাত্রলীগে আমরা যেসব অতিউৎসাহী নেতাকর্মী ও হেলমেট বাহিনী দেখেছি, তা ছাত্রলীগের মূল অংশ নয়। এই অতিউৎসাহী গোষ্ঠীই ছাত্রলীগের ভেতরে থাকা ঘুন পোকা কিংবা গুপ্ত। এদের নানাবিধ অপকর্ম ছাত্রলীগকে জর্জরিত করে ফেলেছিল। জুলাই ম্যাচাকারের মধ্য দিয়ে এই শ্রেণিটিকে নতুন রূপে আবিষ্কার করা গেছে। এই গুপ্ত বাহিনীই আজকের এনসিপি, শিবিরসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করেছে। ছাত্রলীগ বিরোধী শক্তিগুলো ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে নানা রূপে সক্রিয় ছিল, এসব চিত্রপট তার বড় প্রমাণ। এরা যেমন ছাত্রলীগের বাইরে থেকে ছাত্রলীগকে আঘাত করেছে, তেমনি ‘কোচের ছুরি’ হয়ে পেট কেটে বেরিয়েও গেছে।
ছাত্রলীগের জন্য এ এক বড় ট্রাজেডি। এসব ষড়যন্ত্রকারীদের কূটচালে ছাত্রলীগের অসংখ্য প্রকৃত ও ত্যাগী নেতাকর্মী ছিটকে পড়েছে, বঞ্চিত হয়েছে এমনকি নিজেদের হাতেও অবিশ্বাসের দায়ে খুনের মতো ঘটনা ঘটিয়েছে! এই যে ‘শত্রু ও মিত্র’ না চেনার দায় ছাত্রলীগকে বহন করতে হচ্ছে, তা আমরা কীভাবে দেখব? ছাত্রলীগের উপর যে কালিমা লেপন করা হয়েছে, তার গৌরবময় ইতিহাসকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে যেসব প্রেক্ষাপট ও ন্যারেটিভ বা ভাষারাজনীতির ঐতিহাসিক বয়ান নির্মাণ করা হয়েছে, তা নিয়ে নির্মোহ বিশ্লেষণই বা কে করবে? এর জন্য আমাদের বুদ্ধিজীবী শ্রেণির পক্ষপাতহীন রাষ্ট্রনৈতিক দর্শন যেমন প্রয়োজন, তেমনি ছাত্রলীগকেও রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণে ঐতিহাসিক বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান আহরণও আবশ্যক। অন্যথায় যুগব্যাপী নিপীড়নের শিকার হয়েও, ‘নিপীড়ক’র দাগ নিয়ে রাজনীতির বন্ধুর পথে বারবার দিকভ্রান্ত হতে হবে কিংবা হতাশার কালো ছায়া গ্রাস করে নিবে আগামীর উজ্জ্বল সম্ভাবনাটুকুও।
আগামীর উজ্জ্বল সম্ভাবনাটুকুকে বাস্তবায়ন করতে ছাত্রলীগকে সদ্য অতীত হওয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোকে খতিয়ে দেখতে হবে। ছাত্ররাজনীতিতে ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে সংগঠিত কালার রেভ্যুলেশন যে নব্য রাজনৈতিক মেরুকরণ করেছে, তার প্রতিটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, কৌশল ও ফ্যাক্টরগুলো খুঁজে পেতে হবে। সেই সঙ্গে এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে সংঘাতপূর্ণ সম্পর্কে তৈরি হয়েছে, সেই সংঘাতময় সম্পর্ককে শীতল করতে দক্ষিণপন্থী শক্তি ও মার্কিন রেজিম চেঞ্জ প্রক্রিয়াকে সামনে উপস্থাপন করাও প্রয়োজন। কোটা আন্দোলনের শুরুর দিকে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর যেসব হামলার অভিযোগ উঠেছিল, তার দায় নিয়েও ভাবা দরকার। ভেতরে থাকা গুপ্তদের কার্যকলাপ ইতোমধ্যে প্রকাশিত হওয়ায় ছাত্রলীগের দায়মুক্তি ঘটেছে, এমন ভেবে বসে থাকাটা কল্যাণকর নয়।
শুধুমাত্র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ছাত্রলীগের উপর আক্রমণ ব্যাপক হয়েছে, এমনটি নয়। জুলাই থেকেই ছাত্রলীগ আক্রান্ত ছিল, সেই সত্যিটুকুও সামনে আনা প্রয়োজন। জুলাইজুড়ে ছাত্রলীগ ও পুলিশ ভয়ঙ্করভাবে মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার হয়েছে। মিডিয়া ফ্রেমিং এমনটা ছিল, পুলিশ ও ছাত্রলীগই যেখানে প্রধান আক্রমণকারী। ফলে, জুলাইয়ের কলাকুশলীদের ভায়োলেন্স জনগণের দৃষ্টির আড়ালেই পড়ে ছিল। আড়ালে ছিল সক্রিয় নানা সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলো। ফলে, আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাতের পরপরই দেশব্যাপী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ওপর ভয়াবহ হামলার ঝড় বয়ে যেতে থাকে। ইতোমধ্যে বহু নেতাকর্মীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাদের অনেকের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। অনেক নেতাকর্মী প্রাণভয়ে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এই চরম রূপ ছাত্রলীগের তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের জীবনকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
রাজনীতির মাঠের এই নিষ্ঠুর খেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভুক্তভোগী নেতাকর্মীদের পরিবার। নিহত বা পঙ্গু হয়ে যাওয়া অধিকাংশ নেতাকর্মীই মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় যে বাবা-মা বুক বেঁধেছিলেন, রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে তাদের সেই স্বপ্ন ভস্মীভূত হচ্ছে। ছাত্রলীগের সাধারণ নেতা-কর্মীরাই মূলত এই হত্যা ও নির্যাতনের প্রধান শিকার। আইনি সহায়তার অভাব, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই সব হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন না হওয়ার প্রবণতা, যা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর আর্তনাদকে আরও দীর্ঘায়িত করে তুলছে।
ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ওপর এই ধারাবাহিক হত্যা ও নির্যাতন দেশের সামগ্রিক ছাত্ররাজনীতির চরম অবক্ষয়কে নির্দেশ করে। আদর্শিক রাজনীতির জায়গা যখন দখল করে নেয় অস্ত্র, অর্থ এবং পেশিশক্তি, তখন এই ধরণের সহিংসতা ও প্রতিহিংসাপরয়ণতা পুরো রাজনৈতিক কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসা প্রয়োজন। অন্যথায় দেশের অনেক সম্ভাবনাময় মুখ আমরা হারিয়ে ফেলব। শুধুমাত্র রাজনৈতিক বৈপরীত্যের কারণে কোনো একজন তরুণ হত্যাযোগ হয়ে উঠতে পারে, তা কোনো সভ্য দেশের চিত্র হতে পারে না। গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই বহুত্ববাদ। বহুদল, বিপরীত মত না থাকলে ভালো মন্দের তফাৎ বোঝা যায় না। সেটাকে অবরুদ্ধ করাটাই তো ফ্যাসিবাদ। এই ফ্যাসিবাদের যে চূড়ান্ত রূপ আমরা বর্তমানে দেখছি, তা যদি এভাবে চলতে থাকে তাহলে এই দেশে মানবিক ধ্বস ডেকে আনবে। এই চরম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মানবিক বোধের খুব বেশি প্রয়োজন। খুব বেশি প্রয়োজন মানবাধিকার রক্ষা করা। ছাত্রলীগের বেলায় যেভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে, তা ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবেই প্রতিয়মান হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত না করা গেলে চরমপন্থার উত্থান আরও বিপর্যয় ডেকে আনবে।
ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হত্যা ও নির্যাতনের যে ইতিহাস বাংলাদেশে ইদানিংকালে রচিত হচ্ছে, তা রাজনৈতিক সহিংসতার প্রচলিত রূপগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে। মধ্যযুগীয় এসব বর্বরতা যে কালো অধ্যায় লিখে যাচ্ছে, সময় এর প্রতিদান কীভাবে ফিরিয়ে দিবে, তা প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোকে ভাবা প্রয়োজন। কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনীতির নামে এই ধরণের হত্যার খেলা মেনে নেওয়া যায় না। মেধার বিকাশ এবং দেশের সেবার উদ্দেশ্যে যে তরুণরা রাজনীতিতে যুক্ত হয়, তাদের জীবন এভাবে অকালে ঝরে যাবে, তা হতে পারে না। অতীতের ভুলভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে, প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে ছাত্রলীগকে ছাত্ররাজনীতির গৌরবময় অতীতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
লেখক: কবি ও কলামিস্ট