শিক্ষিত, ভদ্রলোক বাঙালি আরজিকর নিয়ে দলে দলে রাস্তায় নেমে এসেছিলো মোমবাতি হাতে। খুব ভালো করেছিলো।

কিন্তু এখন এই বর্বর, অমানবিক গরীব হকার উচ্ছেদে তারা একেবারে চুপ। কোনো প্রতিবাদ নেই এই বুলডোজার ধ্বংসের বিরুদ্ধে। বরং, অনেকেই উল্লাস প্রকাশ করছে। এবং এই নীরবতা ও উল্লাসের মাধ্যমে তারা বাংলায় ফ্যাসিবাদী, স্বৈরতান্ত্রিক শাসকদের হাত শক্ত করছে।

বিজেপি আরএসএস ঠিক এটাই চেয়েছিলো। তারা বুর্জোয়া বাঙালির সুবিধাবাদী চরিত্র ঠিক ধরেছিলো।

এই সমর্থকদের মধ্যে যেমন আছে কাল ছিলাম তৃণমূল, খেয়েছিলাম দুধ ঘি কিন্তু আজ আমি হয়ে গেছি বিজেপি — সেই কুড়িজন টিএমসি সাংসদ আছে, তেমন আছে সিপিএম-পন্থী অসংখ্য একসময়ে বাংলাকে বুড়ো আঙুলের তলায় চেপে রাখা মার্ক্সবাদী বিপ্লবী। আমি নিজে তাদের অনেককে চিনি।

এরা শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পা ধরে টেনে নামিয়ে ক্ষান্ত হয়নি। এখন এরা রীতিমতো হিন্দুত্ববাদী, এবং উগ্র ধর্মান্ধতার সমর্থক। রাস্তায় ঘাটে ট্রেনে বাসে বিমানে যে কোনো তৃণমূল সাংসদ, এমএলএ বা স্থানীয় নেতা ও নেত্রীকে ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো তাড়া করা, কিংবা চোর চোর বলে চীৎকার করা, এমন কি মারধোর করা, বিবস্ত্র করে রাস্তা দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়াকেও এরা সমর্থন করছে। আজ একজন শিক্ষিকাকে রাস্তায় অসভ্য ইতরভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, মিথ্যা অভিযোগে।

এই ট্রেণ্ড এখন চলবে। নিরীহ মানুষ আক্রান্ত হবে, অত্যাচারিত হবে পথে ঘাটে। তিলকধারী মাফিয়া বাড়ির মধ্যে ঢুকে যা খুশি করবে, যা খুশি বলবে।

যারা আমাকে জিজ্ঞেস করে ফ্যাসিবাদ কী, এই উদাহরণগুলোই আমার উত্তর। এমন জিনিসের কথা আমরা বইতে পড়েছি হিটলার মুসোলিনির জমানায়, কিন্তু নিজের চোখে কখনো দেখিনি। এমন কি, নকশাল-কংগ্রেস-সিপিএমের রক্তাক্ত দিনগুলোতেও দেখিনি।

কাল এই ভদ্রলোক বিজেপি বাঙালি যে কোনো ছুতোয় যে কোনো বিরোধী পক্ষের ব্যক্তিকে বিনা বিচারে জেলে নিয়ে যাওয়াকেও সমর্থন করবে। দুজন সাংবাদিক আক্রামুল বাগানী ও প্রবীর বিশ্বাসকে অলরেডি গ্রেফতার করে জেলে নিয়ে গেছে, এবং বিনা বিচারে তারা আটক আছে। তাদের জামিন হয়নি, যদিও তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের কোনো প্রমাণ নেই। যে সব ব্যক্তি আগে বাক-স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে গলা ফাটিয়েছে, আজ তারা পিনড্রপ সাইলেন্ট।

আরজিকরের সময় থেকেই দেওয়াল লিখন লেখা হয়ে গিয়েছিলো, ভদ্রলোক শিক্ষিত বাঙালি — সিপিএম সিপিআই বিজেপি সবাই যে কোনো মূল্যে, যে কোনো জালিয়াতি, দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে মমতাকে টেনে নামাবেই।

আমরা বুঝতে পেরে সাবধান করে দেওয়ার অনেক চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি।

আমাদের মতো দূরের মানুষদের কথাকে পাত্তা দেওয়া হয়নি। এমন কি, রাস্তায় নেমে সারা জীবন লড়াই করে চলেছেন যে সব সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত, সর্বত্যাগী রাজনৈতিক নেতা নেত্রী ও কর্মীরা, তাঁরাও আমাকে বলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কারুর কথা শোনেন নি, কারুর ফোন তাঁর কাছে পৌঁছোয় নি। তিনি দরকার হলে ফোন করেছেন, কিন্তু কেউ তাঁর কাছে নিজের থেকে পৌঁছোতে পারেনি বিশেষ মাধ্যম ছাড়া।

তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বলে এসেছেন ছাব্বিশের কঠিন লড়াই তিনি সামলে নেবেন। কিন্তু রাস্তায় রকে গ্রামে ও শহরে কান পাতলেই যে বিজেপি আসছেই এবার, এই হুইস্পারিং ক্যাম্পেন চালানো হয়েছিলো, তিনি তাকে অগ্রাহ্য করেছেন। বাংলার বাইরেও এবং বাংলাদেশেও এই হুইস্পারিং ফিসফাস অন্তরালের প্রোপাগাণ্ডা ক্রমাগত চালিয়ে যাওয়া হয়েছে, যাতে লোকে বিজেপিকেই ভোট দেয়।

অভিষেকের বিরুদ্ধে বহু মানুষের যে তীব্র ক্ষোভ ছিল, তাকেও তিনি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছেন।

তৃণমূলের এই পরাজয়ে শুধু যে ফ্যাসিস্ট বিজেপি ধর্মান্ধ উগ্রপন্থী সাম্প্রদায়িক আরএসএসের হাত ধরে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে পড়লো, তাই নয়। এমন মারাত্মক সর্বনাশ হলো যে বাংলায় বিরোধী শক্তি বলেই আর তেমন কিছু থাকলো না। আজ সারা ভারতে কৃষক থেকে বনবাসী, আদিবাসী থেকে অত্যাচারিত নারীরা এবং বিশেষ করে অপমানিত, অসম্মানিত, প্রতারিত যুব সম্প্রদায় বিজেপির অপশাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে এসেছে। কিন্তু বাংলা এই মুহূর্তে সেই অত্যাচারীদের থালা সাজিয়ে ডেকে নিয়ে এলো।

রামমোহন বিদ্যাসাগর রবীন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণদেব জগদীশচন্দ্র সূর্য সেন নজরুল সুভাষ বসু প্রীতিলতা মাতঙ্গিনীর বাংলায় ঢুকে পড়লো বল্লাল সেন নবকৃষ্ণ রাধাকান্ত নেত্র সেন ও বর্গীরা।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূল কংগ্রেসকে এর দায় নিতেই হবে।

তাদের অবিশ্বাস্য দুর্নীতি, তাদের ওই কুড়িজন সাংসদের মতো রেনিগেড নেতা ও নেত্রী, অভিষেক, ডিকটেটোরিয়াল মনোভাব ও কাজকর্ম, মানুষের জীবনের থেকে দূরে সরে গিয়ে ঔদ্ধত্যের রাজনীতি — সবকিছুই এই বিপর্যয়ের জন্যে দায়ী।

শুধু SIR, পরিকল্পিত জালিয়াতি, মিডিয়ার মগজধোলাই অথবা বিজেপির মিথ্যে প্রতিশ্রুতি এই পরাজয়ের একমাত্র কারণ নয়।

তৃণমূল নিজেই এই ভয়াবহ গণতন্ত্র ধ্বংসের, মানবতা ধ্বংসের এক প্রধান কারণ।