চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব ও চরিত্র নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চাসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্ব পেয়েছে- যে প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ যে ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে, তার নেতৃত্বও কি সেই ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ বা অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের হাতে থাকা উচিত নয়?

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নিয়োগের প্রবণতা ছিল। এর পক্ষে যুক্তি হিসেবে প্রশাসনিক দক্ষতা, সরকারি সমন্বয়, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, সব প্রতিষ্ঠানকে একই ধরনের প্রশাসনিক কাঠামো ও নেতৃত্বের মাধ্যমে পরিচালনা করা যায় না। একটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্পকলা একাডেমি বা শিশু-কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা এক নয়।

জুলাই-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ কাঠামোতে এই উপলব্ধির আংশিক প্রতিফলনও দেখা গেছে। বাংলা একাডেমির নেতৃত্বে একজন সাহিত্য-গবেষক ও শিক্ষাবিদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শিল্পকলা একাডেমিতেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র অন্তত কিছু ক্ষেত্রে স্বীকার করেছে যে সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে নয়, বরং বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং সৃজনশীল নেতৃত্বের মাধ্যমেও পরিচালিত হতে হয়।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির বর্তমান নেতৃত্বের প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় এসেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালকের দায়িত্বে আছেন একজন প্রশাসন ক্যাডারের সরকারি কর্মকর্তা। ব্যক্তিগত যোগ্যতা বা প্রশাসনিক দক্ষতার প্রশ্ন এখানে বিবেচ্য নয়। মূল প্রশ্ন হলো, একটি জাতীয় শিশু-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে কেমন ধরনের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্র অগ্রাধিকার দেবে।

বাংলাদেশ শিশু একাডেমি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়। এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শিশুদের সাহিত্যচর্চা, শিল্পবোধ, সাংস্কৃতিক বিকাশ, কল্পনাশক্তি এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশকে কেন্দ্র করে। শিশুর পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা, শিশুদের নাটক, সংগীত, চিত্রাঙ্কন, বিজ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিশুদের জন্য সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করাই এই প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য। অর্থাৎ শিশু একাডেমির কাজ কেবল শিশুদের জন্য কিছু কর্মসূচি পরিচালনা করা নয়, বরং ভবিষ্যৎ নাগরিকদের মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য জাতীয় পরিবেশ তৈরি করার গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

এই কারণেই শিশু একাডেমির নেতৃত্বের প্রশ্নটি প্রশাসনিক নিয়োগের সাধারণ প্রশ্ন নয়। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব প্রায়ই তার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে। একজন প্রশাসকের কাছে একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য মূল্যায়নের সূচক হতে পারে প্রকল্প বাস্তবায়নের হার, বাজেট ব্যবহারের দক্ষতা, অবকাঠামো উন্নয়ন বা প্রশাসনিক কার্যক্রমের গতি। অন্যদিকে একজন শিশুসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ বা শিশু-সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে ভিন্ন কিছু সূচক- কত শিশু নিয়মিত বই পড়ছে, কত শিশু গ্রন্থাগারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, কত নতুন শিশু সাহিত্য প্রকাশিত হয়েছে, কত শিশু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছে অথবা দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের শিশুদের কাছে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কতটা পৌঁছেছে।

এখানে কোনো একটি দক্ষতাকে অন্যটির বিপরীতে দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। প্রশাসনিক দক্ষতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি শিশু-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানের নীতিগত ও সৃজনশীল দিকনির্দেশনা নির্ধারণে কোন ধরনের অভিজ্ঞতা অধিকতর প্রাসঙ্গিক। শিশু একাডেমির মূল কাজ যেহেতু শিশুমন, কল্পনা, সাহিত্য, শিল্প ও সৃজনশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই এর নেতৃত্বেও এসব ক্ষেত্রের গভীর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই অধিকতর কার্যকর হতে পারে।

এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশুদের পাঠাভ্যাস নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ডিজিটাল বিনোদনের দ্রুত বিস্তার, মোবাইলনির্ভর অবসরযাপন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক মনোযোগের সংস্কৃতি শিশুদের বইপড়ার অভ্যাসকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই পরিস্থিতিতে শিশু একাডেমির সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হওয়া উচিত জাতীয় পর্যায়ে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা, মানসম্মত শিশু সাহিত্য প্রকাশ ও অনুবাদে উৎসাহ দেওয়া, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের গ্রন্থাগার ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং শিশুদের জন্য বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য ও শিল্পচর্চার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও দেখায় যে শিশু-কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্বে প্রায়ই শিক্ষাবিদ, লেখক, শিশুমনোবিজ্ঞানী কিংবা সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞদের রাখা হয়। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের কাজ কেবল প্রশাসনিক সেবা প্রদান নয়, শিশুদের সৃজনশীল বিকাশ, কল্পনাশক্তি এবং মানবিক সক্ষমতা গড়ে তোলা। বাংলাদেশের ইতিহাসও এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অতীতে বিভিন্ন সময়ে সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী ও শিশু-সাহিত্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শিশু একাডেমির নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং প্রতিষ্ঠানটির সাংস্কৃতিক চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

এখানে আরেকটি বাস্তবতাও বিবেচনা করা প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় ধরে যদি একটি সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান প্রধানত প্রশাসনিক যুক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে ধীরে ধীরে তার অগ্রাধিকারও পরিবর্তিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তখন প্রতিষ্ঠানটি তার মূল সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল ভূমিকার পরিবর্তে মন্ত্রণালয়ের একটি প্রশাসনিক সম্প্রসারণে পরিণত হতে পারে। শিশু একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর কার্যকারিতা পরিমাপ করা যায় না কেবল অবকাঠামো বা প্রকল্পের মাধ্যমে, বরং তা পরিমাপ করতে হয় শিশুদের পাঠাভ্যাস, সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ, সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তির বিকাশের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় তাই শিশু একাডেমির নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। এটা কোনো ব্যক্তি বা পেশাগত গোষ্ঠীর প্রশ্ন নয়, এটা প্রতিষ্ঠানের চরিত্র এবং রাষ্ট্রের শিশু-নীতি সম্পর্কিত প্রশ্ন। প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক তদারকির জন্য দক্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা অবশ্যই থাকবে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের নীতিগত ও সৃজনশীল নেতৃত্বে একজন স্বীকৃত শিশুসাহিত্যিক, শিশু-সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ অথবা শিশু বিকাশ বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞকে নিয়ে আসা সময়ের দাবি।

জুলাই আন্দোলনের পর রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর চরিত্র পুনর্গঠনের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, শিশু একাডেমির ক্ষেত্রেও সেই পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে না, তা নির্ভর করে আগামী প্রজন্মের কল্পনাশক্তি, পাঠাভ্যাস, মানবিকতা এবং সৃজনশীল সক্ষমতার ওপরও। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মহাপরিচালক পদে অতিদ্রুত একজন শিশুসাহিত্যিক বা শিশু-সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞকে নিয়োগ দেওয়া শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হবে না, এটা হবে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।