তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে ঘিরে বাংলাদেশের জনপরিসরে দুটি ভিন্ন বয়ান সমান্তরালে চলেছে। একদিকে এটি উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষার প্রতীক; অন্যদিকে অনেকেই এটিকে ভারত-চীন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি অধ্যায় হিসেবে দেখেন। কিন্তু এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির বাইরেও একটি তৃতীয় পথ রয়েছে—যেখানে তিস্তা মহাপরিকল্পনা হতে পারে হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত আঞ্চলিক সহযোগিতা, সংযোগ এবং যৌথ সমৃদ্ধির একটি ভিত্তি।এই ভিত্তিকেই এগিয়ে নেয়ার কথা বলে আসছে, ‘ তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ ‘।

আজকের বিশ্বে উন্নয়নের ভাষা বদলে গেছে।বদলে যাচ্ছে সনাতনী রাজনীতির ভাবধারা। একসময় রাষ্ট্রগুলো শুধু সীমান্ত রক্ষা ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হিসাব করত। এখন প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সংযোগ, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও জাতীয় শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যে অঞ্চল যত বেশি সংযুক্ত, তার অর্থনীতি তত বেশি গতিশীল।পৃথিবী আজ এক কেন্দ্রীক বিশ্ব ব্যবস্থার বিপরীতে বহু মেরু কেন্দ্রীক বিশ্বের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

এই বাস্তবতায় চীনের Belt and Road Initiative (BRI) একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অবকাঠামো ও সংযোগ উদ্যোগ। বাংলাদেশ এই উদ্যোগের অংশীদার। একই সঙ্গে বাংলাদেশ বিবিআইএন (BBIN), বিমসটেক (BIMSTEC) এবং অন্যান্য আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামোতেও সক্রিয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান কোনো একক প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বহুমাত্রিক সংযোগ ও সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

এই প্রেক্ষাপটে তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে শুধু নদী উন্নয়নের প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত সম্ভাবনা ধরা পড়ে না। এটি হতে পারে হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত করিডরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

হিমালয় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির আধার। এখান থেকেই উৎপন্ন অসংখ্য আন্তঃসীমান্ত নদী দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে ধারণ করে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, হিমবাহের পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা এই অববাহিকাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ফলে শুধু দ্বিপক্ষীয় নয়, বহুপাক্ষিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।

তিস্তা সেই সহযোগিতার একটি পরীক্ষাক্ষেত্র হতে পারে।

নেপালের বিপুল জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা, ভুটানের নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, ভারতের বিশাল বাজার ও অবকাঠামো, বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর, উৎপাদনশীল অর্থনীতি ও ভৌগোলিক অবস্থান এবং চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রকৌশল ও অবকাঠামো নির্মাণের সক্ষমতা—এই সম্পদগুলোকে যদি প্রতিযোগিতার পরিবর্তে পরিপূরক শক্তি হিসেবে দেখা যায়, তাহলে সমগ্র অঞ্চলই লাভবান হতে পারে।

বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারের মধ্যে সংযোগ সম্প্রসারণ নিয়ে বহু বছর ধরেই আলোচনা রয়েছে। এই সংযোগের উদ্দেশ্য কেবল সড়ক নির্মাণ নয়; বরং বাণিজ্য, শিল্প, জ্বালানি, পর্যটন এবং মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি করা। কিন্তু যদি এই আঞ্চলিক সংযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে ভারত আরও গভীরভাবে যুক্ত হয়, তাহলে এর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।বাংলাদেশে চেপে বসা রোহিঙ্গা সংকটও সমাধানের পথ খুঁজে পাবে।

কারণ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, নেপাল, ভুটান এবং মিয়ানমার—সবগুলো অঞ্চল ভৌগোলিকভাবে পরস্পরের নিকটবর্তী এবং অর্থনৈতিকভাবে পরস্পরকে সম্পূরক। একটি সমন্বিত যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এই অঞ্চলগুলোকে নতুন বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, পর্যটন এবং সীমান্ত বাণিজ্যের সুযোগ এনে দিতে পারে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা এই বৃহত্তর সংযোগ ধারণার সঙ্গে যুক্ত হলে এর গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে। নদী ব্যবস্থাপনা, সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এটি আঞ্চলিক লজিস্টিকস, বিদ্যুৎ সঞ্চালন এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোর অংশ হয়ে উঠতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পানি ও বিদ্যুৎকে একসঙ্গে ভাবা। হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য পানি শুধু কৃষির সম্পদ নয়; এটি পরিচ্ছন্ন জ্বালানিরও উৎস। নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, ভারতের সঞ্চালন অবকাঠামো, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য—এসবকে একটি সমন্বিত কাঠামোয় আনতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তা নতুন ভিত্তি পেতে পারে।

একই সঙ্গে প্রয়োজন সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা। যৌথ তথ্য বিনিময়, বন্যার আগাম সতর্কীকরণ, নদীর প্রবাহ পর্যবেক্ষণ, অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচি শুধু বাংলাদেশ নয়, অববাহিকার সব দেশের জন্যই উপকারী হতে পারে। পানি কোনো দেশের একক সম্পদ নয়; আন্তঃসীমান্ত নদীর ক্ষেত্রে সহযোগিতাই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার সবচেয়ে কার্যকর পথ।

অনেকে মনে করেন, ভারত ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা এমন সহযোগিতার পথে প্রধান বাধা। বাস্তবে এই প্রতিযোগিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। তবে এটিও সমান সত্য যে অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা অনেক সময় রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনে সহায়ক ভূমিকা রাখে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা গেছে, যোগাযোগ, বাণিজ্য ও যৌথ অবকাঠামো পারস্পরিক আস্থা গঠনের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায়ও এমন সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বাংলাদেশ এখানে একটি গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ তার পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন হলো ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং উন্নয়ন। বাংলাদেশ এমন একটি কূটনৈতিক উদ্যোগের পক্ষে কাজ করতে পারে, যেখানে তিস্তা মহাপরিকল্পনা কোনো পক্ষের প্রভাব বিস্তারের প্রতীক না হয়ে বহুপাক্ষিক অংশীদারিত্বের একটি উদাহরণে পরিণত হয়।

ভারত যদি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংযোগ উদ্যোগে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হয় এবং বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংযোগের বাস্তবসম্মত ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা বাড়ায়, তাহলে হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত একটি নতুন উন্নয়ন বলয় গড়ে ওঠার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। এর সুফল শুধু রাষ্ট্রগুলো নয়, সীমান্তবর্তী জনপদ, কৃষক, উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষও ভোগ করবে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা তখন শুধু উত্তরাঞ্চলের নদীশাসনের প্রকল্প থাকবে না; এটি হবে পানি, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং জলবায়ু অভিযোজনকে এক সূত্রে গাঁথা একটি সমন্বিত উন্নয়ন মডেল।

তবে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি নীতি অপরিহার্য। প্রথমত, আন্তঃসীমান্ত নদীর ক্ষেত্রে ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার এবং তথ্য আদান-প্রদানের নীতি অনুসরণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সব দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, পরিবেশগত ভারসাম্য, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং টেকসই উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। চতুর্থত, অবকাঠামো যেন ঋণ, নিরাপত্তা বা কৌশলগত প্রতিযোগিতার উৎস না হয়ে পারস্পরিক লাভজনক অর্থনৈতিক সংযোগের ভিত্তি হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।উজান-ভাটির সম্পর্ক শক্তিমত্তার জোরে নির্ধারিত হবে না, হবে ন্যায্যতা ও সমতার আদর্শে।

তিস্তা আজ বাংলাদেশের কাছে একটি নদীর চেয়ে অনেক বড় কিছু। এটি উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নের প্রশ্ন, জলবায়ু সহনশীলতার প্রশ্ন এবং একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ সহযোগিতারও প্রশ্ন। তাই তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে ভারত-চীন দ্বৈরথের সংকীর্ণ ফ্রেমে আটকে না রেখে হিমালয়-বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের একটি বহুপাক্ষিক উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবে কল্পনা করার সময় এসেছে।

হয়তো একদিন ইতিহাস বলবে, তিস্তার তীরেই দক্ষিণ এশিয়া উপলব্ধি করেছিল—নদীকে ভাগ করা যায়, কিন্তু নদীর ভবিষ্যৎকে নয়; উন্নয়নের পথ প্রতিযোগিতায় নয়, সহযোগিতায় আরও সুদূর প্রসারিত হয়।

লেখক: সভাপতি,তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ, প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ(অবসরপ্রাপ্ত) , ইটাকুমারী শিবচন্দ্র রায় কলেজ, পীরগাছা,রংপুর।
ইমেইল :[email protected] mobile :01719257268