বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন নিয়ে আলোচনা হলেই আমাদের চোখের সামনে সাধারণত ভেসে ওঠে মেয়েশিশুর মুখ। সংবাদ শিরোনাম, টেলিভিশনের টকশো, সামাজিক আন্দোলন- সবখানেই মেয়েশিশুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে এবং তা থাকা উচিতও। কিন্তু একই সময়ে আরেকটি বাস্তবতা প্রায় অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে। সেটা হলো ছেলেশিশুর বিরুদ্ধে সংঘটিত যৌন সহিংসতা।
সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে অন্তত ৪৩ জন ছেলে শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে। বিভাগভিত্তিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে রাজশাহী বিভাগে। সংখ্যাটি হয়তো প্রথম দেখায় খুব বড় মনে নাও হতে পারে। কিন্তু শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, ছেলে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশিত পরিসংখ্যানের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ার আশংকা আছে। কারণ, অধিকাংশ ঘটনাই পরিবার বা সমাজের চাপে গোপন থেকে যায়।
সমস্যার শুরু ভাষা থেকেই। বাংলাদেশে ছেলে শিশুদের ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে প্রায়শই “বলাৎকার” শব্দটি ব্যবহার করা হয়। যেন এটা ধর্ষণ নয়, কিংবা মেয়েশিশুর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের তুলনায় ভিন্ন কোনো ঘটনা। কিন্তু আইনের ভাষায়, মানবাধিকারের ভাষায় এবং শিশুর মানসিক যন্ত্রণার ভাষায় এটা নিঃসন্দেহে যৌন সহিংসতা, এটা ধর্ষণ।
শব্দের এই বিভাজন কেবল ভাষাগত নয়, এটা সামাজিক মনস্তত্ত্বেরও প্রতিফলন। আমরা পুরুষ বা ছেলে শিশুকে দুর্বল, অসহায় কিংবা ভুক্তভোগী হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত নই। আমাদের সামাজিক ধারণায় ছেলেরা শক্তিশালী, তারা নিজেদের রক্ষা করতে পারে। ফলে যখন কোনো ছেলে শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন পরিবার অনেক সময় ঘটনাটিকে অস্বীকার করে, আড়াল করে কিংবা প্রকাশ করতে ভয় পায়। লজ্জা, সামাজিক অপমান এবং তথাকথিত পুরুষত্বের ধারণা ন্যায়বিচারের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অপরাধীরা একটি বিপজ্জনক সুবিধা পেয়ে যায়- নীরবতা।
বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ক্রমেই উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে অন্তত ১৬৪ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২৪ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে এবং ভুক্তভোগীদের মধ্যে ১১৭ জনের বয়স ছিল ১০ বছরের নিচে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রায় ৪৪ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত মানুষ।
অর্থাৎ শিশুদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা অনেক সময় রাস্তা নয়, অপরিচিত কেউ নয়, বরং তাদের পরিচিত পরিবেশ, পরিচিত মানুষ।
ইউনিসেফও দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বড় অংশই ঘটে সেই মানুষদের হাতে, যাদের ওপর তারা সবচেয়ে বেশি ভরসা করে- অভিভাবক, শিক্ষক, আত্মীয় কিংবা পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মাধ্যমে।
বিশ্বব্যাপী গবেষণাও একই বাস্তবতার কথা বলছে। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক বৈশ্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পৃথিবীতে বর্তমানে জীবিত প্রায় ২৪ থেকে ৩১ কোটি ছেলে ও পুরুষ শৈশবে কোনো না কোনো ধরনের যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি ১১ জনের মধ্যে প্রায় একজন ছেলে শিশু জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। কিন্তু সামাজিক লজ্জা এবং নীরবতার কারণে তাদের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে কম দৃশ্যমান।
প্রশ্ন হলো, কেন এই অপরাধ বাড়ছে?
প্রথম কারণ বিচারহীনতা। শিশু নির্যাতনের মামলার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। অনেক পরিবার মামলা করতে চায় না, কারণ তারা জানে বিচার পেতে দীর্ঘ সময় লাগবে। অপরাধীর সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় কারণ সামাজিক নীরবতা। বিশেষ করে ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে পরিবারগুলো প্রায়ই ঘটনাকে গোপন রাখে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুকেই দায়ী করা হয়, তার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, কিংবা তাকে চুপ থাকতে বলা হয়।
তৃতীয় কারণ শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা। বহু স্কুল, মাদ্রাসা, আবাসিক প্রতিষ্ঠান, ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কিংবা কর্মক্ষেত্রে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতি নেই। অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা নেই, নেই স্বাধীন তদন্ত প্রক্রিয়াও।
চতুর্থ কারণ সচেতনতার অভাব। অধিকাংশ শিশু এখনো জানে না নিরাপদ স্পর্শ এবং অনিরাপদ স্পর্শের পার্থক্য। অনেক পরিবার এসব বিষয়ে কথা বলাকেই অস্বস্তিকর মনে করে। ফলে শিশুরা বিপদের সংকেত চিনতে শেখে না।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি।
প্রথমত, ছেলে ও মেয়ে- উভয় শিশুর বিরুদ্ধে সংঘটিত যৌন সহিংসতাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ছেলেশিশুর ওপর সংঘটিত অপরাধকে আলাদা ভাষা বা আলাদা সামাজিক মানদণ্ডে বিচার করা যাবে না।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, আবাসিক কেন্দ্র এবং শিশু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতি চালু করতে হবে। অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত এবং প্রতিরোধের স্পষ্ট ব্যবস্থা থাকতে হবে।
তৃতীয়ত, শিশুদের বয়সোপযোগী নিরাপত্তা ও যৌন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপদ স্পর্শ, অনিরাপদ স্পর্শ, সম্মতি এবং সাহায্য চাওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে তাদের জানাতে হবে।
চতুর্থত, ভুক্তভোগী শিশুদের জন্য মনোসামাজিক সহায়তা, আইনি সহায়তা এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। কারণ যৌন সহিংসতার ক্ষত শুধু শরীরে নয়, বহু বছর ধরে মনে বহন করতে হয়।
সবশেষে একটি বিষয় আমাদের স্বীকার করতেই হবে- শিশুর কোনো লিঙ্গ নেই, তার পরিচয় একটাই, সে শিশু।
একজন মেয়ে শিশুর কান্না যেমন আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, তেমনি একজন ছেলে শিশুর নীরবতাও আমাদের শুনতে হবে। কারণ অনেক সময় সবচেয়ে গভীর আর্তনাদই সবচেয়ে কম শোনা যায়।
ছেলেশিশুর সেই নীরব কান্না শোনার সময় এখনই। কারণ একটি সমাজ তার শিশুদের যেভাবে রক্ষা করে, ভবিষ্যৎ তাকে সেভাবেই বিচার করে।