“ভারত বিরোধিতার নামে হিন্দু বিদ্বেষ প্রচার একটি রাজনৈতিক অস্ত্র” —অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ


মীর রবি প্রকাশের সময় : জুন ১৬, ২০২৬, ১০:০৮ পূর্বাহ্ণ
“ভারত বিরোধিতার নামে হিন্দু বিদ্বেষ প্রচার একটি রাজনৈতিক অস্ত্র” —অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ

 

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ একজন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, লেখক, বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী এবং অন্যতম প্রধান জন-বুদ্ধিজীবী। তিনি দেশে মার্কসীয় অর্থনীতি, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা আন্দোলনের প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে সুপরিচিত। বাংলাদেশের চলমান নানা সংকট ও ইস্যু নিয়ে তার সঙ্গে আলাপ করেছেন সময়ের খবরের নির্বাহী সম্পাদক কবি ও কলামিস্ট মীর রবি

মীর রবি: একটা পরিবর্তীত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশ। রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, রাষ্ট্রনৈতিক সংকটের সঙ্গে সামাজিক সংকটও এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। সার্বিক এই পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ: এসব সংকট দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে দিনে দিনে গভীর হয়েছে। কিছুক্ষেত্রে পাত্রপাত্রী আলাদা মাত্র। বহুবছর পরে নির্বাচিত সরকার এসেছে কিন্তু অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আসেনি। কূটনৈতিক ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বোঝাপড়ার কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল যেগুলো আগের অবস্থায় নিয়ে যাবার চেষ্টা চলছে। সামাজিক অসহিষ্ণুতা, সহিংসতা, নারীর নিরাপত্তাহীনতা আমাদের দীর্ঘদিনের সমস্যা।

মীর রবি: ধর্মীয় হিংসতাও বেড়েছে, এর কারণ কি হতে পারে?

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ: ধর্মীয় সহিংসতা, অন্য ধর্ম-মত-তরিকার ওপর আক্রমণ বৃদ্ধি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী শক্তির দাপটের প্রকাশ। এদের এই শক্তিও একদিনে তৈরি হয়নি। গত পাঁচ দশকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির বিভিন্ন সরকার এসব ধর্মীয় শক্তিকে ব্যবহার করতে গিয়ে নিজেরাই ব্যবহৃত হয়েছে, এবং এদের প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক শক্তির বৃদ্ধি ঘটিয়েছে। বিশেষত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের স্বৈরশাসনের নানা নীতি তাদের আরও শক্তিবৃদ্ধি ঘটিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এদের দাপট আগের সব সীমা ছাড়িয়েছে।

মীর রবি: সাম্প্রতিক সীমান্তে পুশ ইন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। সবার দৃষ্টি ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে। ঠিক একই রকম চিত্র মায়ানমার সীমান্তেও রয়েছে। কিন্তু সেটা নিয়ে তেমন কথা হয় না, এর কারণ কি?

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ: ভারত সীমান্তে পুশইন নিয়ে পত্রপত্রিকায় খবর, বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠনের প্রতিবাদ-বিবৃতি, সমাবেশ, লেখালেখি হচ্ছে। মায়ানমারের সাথে সমস্যা ভারতের মতো দীর্ঘদিনের এবং জটিল নয় বলে তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ, রাগ মানে মাথাব্যথা কম। আরও নানা ইস্যুর কারণে হয়তো দেশজুড়ে মনোযোগও আসেনি। তবে ঐ এলাকায় মনোযোগ আলোচনা আছে।

মীর রবি: দেশে বাম দলগুলো দীর্ঘদিন থেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলে আসছে। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাও তাদের বিরুদ্ধে পূর্ব থেকেই কথা বলছেন। মার্কিন ইস্যুতে উভয়ের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কি এক?

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ: এটি একটি ভুল প্রচার। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার কখনোই ভূমিকা ছিল না। বাগাড়ম্বর আর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা এক কথা নয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয় লাভের পর এই সরকারের প্রথম কাজ ছিল আমাদের প্রবল প্রতিবাদ, যুক্তি তথ্য অগ্রাহ্য করে মার্কিন কোম্পানি কনোকো ফিলিপস-এর সাথে তেলগ্যাস চুক্তি করা। শেখ হাসিনার আগের আমলে ১৯৯৭ সালে আরেক মার্কিন কোম্পানি অক্সিডেন্টালের হাতে মাগুড়ছড়া বিস্ফোরণ ঘটে, তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় না করেই আরেক মার্কিন কোম্পানির কাছে ব্যবসা বিক্রি করে তাদের চলে যেতে দেয়া হয়েছে। একইবছর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সোফা ও হানা চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছিল, যেগুলো দেশের উপর মার্কিন খবরদারির পথ তৈরি করেছিল।

মীর রবি: তিনি তো পতনের আগেও মার্কিন বিষয়ে কথা বলেছিলেন…

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ: পতনের আগে আগে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ভারতসহ গঠিত কোয়াড সামরিক জোটের সাথে কাজ করার ব্যাপারে সরকার আলোচনা করছিল। প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস মার্কিন কোম্পানির লবিস্ট হিসেবে শেখ হাসিনার সাথে দেনদরবার করছিলেন, একটি মার্কিন কোম্পানির পক্ষে তেল গ্যাস চুক্তির বিষয়ে বোঝাপড়াও হয়েছিল, সে অনুযায়ী উৎপাদন অংশীদারী চুক্তির দলিল পরিবর্তনও করা হয়েছিল। জো বাইডেন এর সাথে হাসিনা পরিবারের সেলফি তোলার পর সরকার থেকে মার্কিন সমর্থন নিয়ে প্রচারও হচ্ছিলো। সর্বোপরি বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির কর্তৃত্বে অর্থনীতি পরিচালনা মানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্ত ভূমিকা পালন করা। এযাবত সব সরকারই এই ভূমিকাই পালন করেছে, করছে। শেখ হাসিনা দৃঢ়তার সাথে তাদের বিভিন্ন নীতি ও প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখায় ক্ষমতায় থাকাকালে এদের কাছ থেকে তিনি অনেক প্রশংসাও পেয়েছেন ।

মীর রবি: দেশে ভারত বিরোধীতার নামে হিন্দু বিদ্বেষ বেড়েছে। গাইবান্ধায় একটি মন্দির নির্মাণ নিয়ে ভারত ‘রংপুর দখল করবে’ এমন প্রোপাগান্ডাও ছড়ানো হয়েছে। এমনসব ঘটনা আপনার বিশ্লেষণে কতটুকু রাজনৈতিক ও কতটুকু সাম্প্রদায়িক বলে মনে করছেন?

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ: ভারত অনেক অতিরঞ্জিত প্রচার চালাচ্ছে। এখানেও অনেক সাম্প্রদায়িক অতিরঞ্জিত প্রচার আছে। তবে সমাজের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার চাষ বহুদিন থেকেই চলছে। হাসিনা সরকারের সময় অনেকগুলো সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে যার যথাযথ বিচার হয়নি। ওয়াজে, অনলাইনে সাম্প্রদায়িকতার পাশাপাশি ভিন্নমতের মানুষদের বিরুদ্ধে প্রচার উস্কানিও চলেছে তখন।

মীর রবি: এটা কি অন্তবর্তী সরকারের সময়ে আরও বাড়েনি?

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ: অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় মদদ পেয়ে এসব সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদী শক্তির অপতৎপরতা আরও বেড়েছে। ভারতের বিরুদ্ধে আমাদের অনেকগুলো যৌক্তিক অভিযোগ আছে। কিন্তু এসব শক্তির সাম্প্রদায়িক তৎপরতা প্রকৃত ইস্যুগুলোর সমাধানও বাধাগ্রস্ত করে, জনগণকে শত্রুমিত্র যথাযথভাবে সনাক্ত করতেও বাধা দেয়। ভারত বিরোধিতার নামে হিন্দু বিদ্বেষ প্রচার একটি রাজনৈতিক অস্ত্র যা বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী শক্তিকে পুষ্টি যোগায়।

মীর রবি: সারাদেশে তরুণদের মাঝে ইসলামী উগ্রবাদের প্রতি একধরনের ফ্যান্টাসি কাজ করছে। শেষ পর্যন্ত তরুণদের এই ইন্টারেস্ট দেশকে কোন দিকে নিয়ে যেতে পারে?

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ: এটা খুবই বিপজ্জনক পরিস্থিতি। চিন্তার দৈন্য, অন্ধত্ব এবং অসহিষ্ণুতা এক হয়ে এই অবস্থা হয়। এর পেছনে দেশের ভেতরে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা, আপোষকামিতা সেই সাথে বাম দলগুলোর দুর্বলতা যেমন কাজ করছে তেমনি বৈশ্বিক পরিস্থিতিও ভূমিকা রাখছে।

মীর রবি: জঙ্গিবাদের সঙ্গে মার্কিন সংশ্লিষ্টতা…

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ: জঙ্গি দমনের নামে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জঙ্গি তোষণও এসব শক্তির বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে।

মীর রবি: মুক্তির উপায় কি হতে পারে বলে আপনি ভাবছেন?

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ: বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক তৎপরতার বিস্তার ঘটিয়ে সমাজে চিন্তা ও বিশ্লেষণের শক্তি বৃদ্ধিই এই প্রাণবিনাশী প্রবণতা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ।

মীর রবি: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ স্যার

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ: তোমাকেও ধন্যবাদ।

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০