
একসময় হোয়াংহো বা পীত নদীকে বলা হতো “চীনের দুঃখ”। প্রায় প্রতি বছরই ভয়াবহ বন্যা, নদীভাঙন ও গতিপথ পরিবর্তনের কারণে লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপর্যস্ত হতো। অন্যদিকে এশিয়ার দীর্ঘতম নদী ইয়াংসি ছিল বিপুল সম্ভাবনার আধার, কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত বন্যা ও অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে সেই সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটছিল না।
আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে হোয়াংহো একসময় দুর্যোগের প্রতীক ছিল, সেটি এখন কৃষি, শিল্প ও আঞ্চলিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। আর ইয়াংসি নদী পরিণত হয়েছে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তিতে। প্রশ্ন হচ্ছে—চীন কীভাবে এই রূপান্তর ঘটালো? এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ, বিশেষত তিস্তা অববাহিকার উন্নয়নের জন্য আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি?
চীনের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা নদীকে কেবল পানির উৎস হিসেবে দেখেনি; বরং নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছে সমন্বিত অর্থনৈতিক অঞ্চল। কৃষি, শিল্পায়ন, পর্যটন,নৌপরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নগর উন্নয়নকে তারা একই পরিকল্পনার আওতায় এনেছে। হোয়াংহো ও ইয়াংসি নদীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে নদী নিয়ন্ত্রণ, বন্যা ব্যবস্থাপনা, পানি সংরক্ষণ এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিকে একটি সমন্বিত কাঠামোয় পরিচালিত করেছে।
বিশেষ করে ইয়াংসি নদীর ওপর নির্মিত থ্রি গর্জেস ড্যাম শুধু একটি বাঁধ নয়; এটি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নৌপরিবহন উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বিকাশের একটি সমন্বিত মডেল। একইভাবে হোয়াংহো অববাহিকায় ড্রেজিং, তীর সংরক্ষণ, জলাধার নির্মাণ এবং আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শতাব্দীপ্রাচীন সংকট মোকাবিলা করা হয়েছে।
বাংলাদেশের তিস্তা নদীর সঙ্গে হোয়াংহোর ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য থাকলেও অনেক বাস্তবতা আশ্চর্যজনকভাবে মিল খুঁজে দেয়। শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সংকট এবং বর্ষাকালে বন্যা ও নদীভাঙনের কারণে তিস্তা অববাহিকার লাখো মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি মানুষ উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার।
অথচ তিস্তা শুধু একটিমাত্র প্রবাহ নয়; এরসঙ্গে জড়িয়ে আছে তিস্তার ২৫ টি শাখা-উপনদী ও প্রশাখা। এটি উত্তরাঞ্চলের প্রাণ-প্রকৃতি,পরিবেশ ও অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের অন্যতম সম্ভাবনার উৎস। একটি সমন্বিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নদী,প্রকৃতির পুনর্জীবনের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বৈষম্যে পিছিয়ে থাকা উত্তরাঞ্চল জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় দৃঢ়ভাবে সম্পৃক্ত হতে পারে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনার মূল দর্শনও নদীকেন্দ্রিক সমন্বিত উন্নয়ন। এর লক্ষ্য শুধু নদী খনন বা বাঁধ নির্মাণ নয়; বরং পানি সংরক্ষণ, আধুনিক সেচব্যবস্থা, নদীশাসন, শাখা-উপনদী ও প্রশাখাগুলোকে জলাধারে রূপান্তর, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, পর্যটন বিকাশ, পরিকল্পিত নগরায়ণ, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি, নৌপরিবহন উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন, আধুনিক কৃষি অঞ্চল এবং শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার একটি সমন্বিত রূপরেখা বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পাওয়ার চায়নার মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) আওতায় পরিচালিত সমীক্ষার হালনাগাদ প্রতিবেদন ইতোমধ্যে সরকারের কাছে জমা হয়েছে। চীনও প্রকল্প বাস্তবায়নে কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ফলে তিস্তা অববাহিকার মানুষের প্রত্যাশা এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। চীন সফরকে ঘিরে উত্তরাঞ্চলের মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে—তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি বা সুখবরের আশায়।
অনেক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও নদী প্রকৌশলী মনে করেন, নদী ব্যবস্থাপনা ও জলসম্পদ উন্নয়নে চীন বিশ্বের অন্যতম দক্ষ দেশ। হোয়াংহো, ইয়াংসি এবং অন্যান্য বৃহৎ নদী অববাহিকায় অর্জিত তাদের প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা তিস্তার মতো নদী ব্যবস্থাপনায় কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব।
চীন আমাদের দেখিয়েছে—নদীকে সমস্যা হিসেবে নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে হয়। হোয়াংহোকে তারা দুর্যোগের প্রতীক থেকে উন্নয়নের ভিত্তিতে রূপান্তর করেছে। ইয়াংসিকে তারা গড়ে তুলেছে একটি অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে। বাংলাদেশও যদি একই দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিস্তাকে কেন্দ্র করে সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে, তাহলে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব।
আজ তিস্তা শুধু একটি নদীর নাম নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি উৎপাদন, কর্মসংস্থান, পরিবেশ নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যখন একের পর এক বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, তখন তিস্তা অববাহিকার কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা এখনও অপূর্ণ রয়ে গেছে।
এই বৈষম্য দূর করতে হলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন কৌশলের অংশ হিসেবে তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে জাতীয় অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এটিই আজ উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের ন্যায্য দাবি।
তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ দীর্ঘদিন ধরে এই দাবিকে সামনে রেখে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। সংগঠনটির মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যদি কোনো ভূরাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়, তবে পদ্মা সেতুর মতো জাতীয় অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিজস্ব উদ্যোগে ও বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ খুঁজতে হবে। সংগঠনের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী উল্লেখ করেন, “পদ্মা সেতুর বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজে যেমন চীনসহ একাধিক দেশ অংশগ্রহণ করেছে, তেমনি তিস্তা মহাপরিকল্পনাও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও জাতীয় অঙ্গীকারের সমন্বয়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।”
চীনের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়—নদীকে অবহেলা করলে তা দুর্যোগ সৃষ্টি করে, আর সঠিক পরিকল্পনা, বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে সেই নদীই জাতীয় সমৃদ্ধির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। হোয়াংহো ও ইয়াংসির গল্প তাই কেবল চীনের উন্নয়নের ইতিহাস নয়; এটি তিস্তার জন্যও একটি সম্ভাবনার দিকনির্দেশনা।
যে চীন একসময় “চীনের দুঃখ” নামে পরিচিত হোয়াংহোকে নিয়ন্ত্রণ করে উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যেতে পেরেছে, সেই অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। এখন সময় এসেছে তিস্তাকে অবহেলার নদী থেকে সম্ভাবনার নদীতে রূপান্তর করার। কারণ তিস্তার উন্নয়ন মানে শুধু একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক মুক্তি, আঞ্চলিক ভারসাম্য, জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের টেকসই অগ্রযাত্রার নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
লেখক: সভাপতি,তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ
ইমেইল : [email protected]
আপনার মতামত লিখুন :