বন্ধুমহল থেকে বিশ্ববাজারে ‘দেshe’-এর যাত্রা


নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশের সময় : জুলাই ২৫, ২০২৬, ৯:৫৩ অপরাহ্ণ
বন্ধুমহল থেকে বিশ্ববাজারে ‘দেshe’-এর যাত্রা

 

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট আর পরীক্ষার ব্যস্ততার মাঝেও থেমে থাকেননি রুমাইয়া করিম রামিসা। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (ইউআইইউ) বিবিএ পড়ার পাশাপাশি নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন তিনি। নারীদের জুয়েলারি নিয়ে গড়ে তুলেছেন নিজের ব্র্যান্ড ‘দেshe’, যা ইতোমধ্যে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেছে পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ক্রেতাদের কাছে।

বন্ধুমহলে বরাবরই নান্দনিক রুচির জন্য পরিচিত ছিলেন রামিসা। সেই পরিচিতিই একসময় ব্যবসার অনুপ্রেরণায় পরিণত হয়। শুরুতে বিভিন্ন জায়গা থেকে জুয়েলারি সংগ্রহ করে বিক্রি করতেন। পরে নিজস্ব ডিজাইনের ধারণা নিয়ে কারিগরদের মাধ্যমে তৈরি করাতে শুরু করেন নতুন নতুন নকশার অলংকার। পেশাদার ডিজাইনার না হয়েও নিজের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করেন আলাদা পরিচয়ের একটি ব্র্যান্ড।
রামিসা বলেন, “ছোটবেলা থেকেই ব্যবসা করার ইচ্ছা ছিল। প্রচলিত ৯টা-৫টার চাকরি কখনোই আমাকে টানেনি। সবসময় স্বপ্ন দেখতাম, একদিন নিজের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলব, যেখানে নিজের পাশাপাশি অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারব। মূলত নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এবং অন্যদের পাশে থাকার ইচ্ছা থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার পথচলা শুরু।”
২০২০ সালে উদ্যোক্তা হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও পথটা মোটেও সহজ ছিল না। বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে কাজ করেছেন, একাধিকবার ব্যর্থ হয়েছেন, লোকসানও গুনেছেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি। দীর্ঘ পাঁচ বছরের চেষ্টা, শেখা এবং অভিজ্ঞতার পর ২০২৫ সালে ‘দেshe’ ব্র্যান্ডকে একটি সফল অবস্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হন।
তার ভাষায়, “এই যাত্রায় আমি বহুবার ব্যর্থ হয়েছি। অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা করেছি, ক্ষতির মুখও দেখেছি। কিন্তু কখনো থেমে যাইনি। আমি বিশ্বাস করি, চেষ্টা চালিয়ে গেলে একদিন না একদিন সফলতা আসবেই। নিজের ওপর সেই বিশ্বাসই আমাকে এগিয়ে নিয়েছে।”
বর্তমানে ‘দেshe’-এর সংগ্রহে রয়েছে কাশ্মীরি চুড়ি, তুর্কিশ রিং, অ্যান্টি-টার্নিশ রিং, গ্লাস ঝুমকা, বিভিন্ন ধরনের বালা ও ফ্যাশন জুয়েলারি। প্রতিটি পণ্যের দাম ৩৫০ টাকা থেকে শুরু করে প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।

পণ্যের মান নিয়েও বেশ সচেতন এই তরুণ উদ্যোক্তা। রামিসা জানান, তাদের পেজে শতভাগ আসল ও মানসম্মত আমদানিকৃত পণ্য বিক্রি করা হয়। বাজারে একই ডিজাইনের নকল বা রিপ্লিকা পণ্য থাকলেও ক্রেতাদের শুরু থেকেই জানিয়ে দেওয়া হয় কোনটি স্থানীয় এবং কোনটি আমদানিকৃত। কোনো ত্রুটি বা সমস্যা দেখা দিলে মাত্র দুই দিনের মধ্যেই পণ্য বদলে দেওয়ার সুবিধাও রয়েছে।

দেশের বাইরে প্রথম অর্ডার পাওয়ার অভিজ্ঞতা এখনো রোমাঞ্চ জাগায় তার মনে। রামিসা বলেন, “আমার প্রথম আন্তর্জাতিক অর্ডার আসে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান থেকে। ক্রেতা খুবই আন্তরিক ছিলেন। মূলত ইনস্টাগ্রামে একটি রিল ভাইরাল হওয়ার পর বিদেশ থেকে সাড়া পাওয়া শুরু হয়। আমি বাংলাদেশের জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী ‘মাওলা মেরে ঝুমকা’ নিয়ে কাজ করছিলাম। সেই রিল দেখেই প্রথম আন্তর্জাতিক অর্ডার আসে। এরপর পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকেও অর্ডার পেয়েছি। ভবিষ্যতে আরও নতুন নতুন দেশে আমাদের ব্র্যান্ড পৌঁছে দেওয়াই লক্ষ্য।”

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করতে গিয়ে কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আন্তর্জাতিক শিপিং প্রক্রিয়া এখনো বেশ জটিল এবং ব্যয়বহুল। যদি এই লজিস্টিক সুবিধা আরও সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আরও দ্রুত বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারবেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থার ব্র্যান্ড— রামিসা এই পথচলা প্রমাণ করে, ধৈর্য, সৃজনশীলতা এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে ছোট্ট একটি অনলাইন উদ্যোগও একদিন বৈশ্বিক বাজারে নিজের জায়গা করে নিতে পারে।