
গণমতের বিকল্প মত ঝুঁকিপূর্ণ। বিকল্পটা মতটা সহজে কেউ গ্রহণ করতে চায় না। তাতে নিন্দিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। গণমত হচ্ছে, লোকটা চোর। অতএব সে সত্যি সত্যি চোর। কোনো বাছ-বিচার ছাড়াই চোর। আদাল কর্তৃক প্রমাণিত হওয়ার আগেই চোর।
গণমত হচ্ছে, মিরপুরের এক ফ্ল্যাটে এক মা সাত দিন ধরে মরে পড়ে আছে, তার লাশে পোকায় ধরে গেছে, অথচ তার চার সন্তানের কেউ মায়ের খোঁজ রাখেনি। অতএব সন্তানরা অমানুষ, তারা মানুষ নামক জানোয়ার, তারা কুলাঙ্গার, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। এখুনি হোক। কোনো দেরি করা চলবে না।
একজন ফেসবুকে সেই চার সন্তানের ছবি দিয়ে তাদেরকে এক হীন জানোয়ারের সঙ্গে তুলনা করে লিখেছে,….এর বাচ্চা। অর্থাৎ গালিটা প্রকারান্তরে তাদের মাকেই দিয়েছে। ওদিকে জনতুষ্টিবাদী সরকারও বসে নেই। জনমতের ওপর ভিত্তি করেই এক সন্তান, যিনি যুগ্মসচিব, মাকে দেখভাল না করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে, তাকে ইতোমধ্যেই ওএসডি করে দিয়েছে।
সেই মৃত মায়ের আত্মার সদগতি কামনা করে নিন্দিত হওয়ার ঝুঁকি আছে জেনেও এ বিষয়ে আমি দ্বিতীয় একটি মত রাখতে চাই। আমরা যা দেখি, সবসময় তা সত্য না-ও হতে পারে। অন্ধকার রাস্তায় পড়ে থাকা দড়িকে আমরা সাপ ভেবে ভুল করে থাকি। এই মৃত মায়ের চার সন্তানকে যে আমরা দোষী সাব্যস্ত করে দিয়েছি, তা কিসের ভিত্তিতে? তাদের প্রয়াত মা কি তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগপত্র রেখে গেছেন? কারো কাছে বিচার দিয়ে গেছেন? একজন, অন্তত একজন মানুষকেও কি বলে গেছেন, আমার সন্তানরা আমার ভরণ-পোষণ দেয়নি, চিকিৎসা সেবা দেয়নি, আমাকে দেখভাল করেনি?
যদি তিনি কোনো অভিযোগ করে না গিয়ে থাকেন, তাহলে কিসের ভিত্তিতে আমরা তার সন্তানদের দোষী সাব্যস্ত করে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিলাম? কোন যুক্তিতে গণমাধ্যম তাদের ছবি এবং পরিচয় প্রকাশ করে তাদেরকে ভিলেন বানিয়ে দিল? কিসের ভিত্তিতে ফেসবুকের ওয়ালে ওয়ালে আমরা তাদের ছবি পোস্ট করে তাদেরকে সামাজিকভাবে হেনস্তা করছি? কোন অধিকারে তাদের স্বাভাবিক জীবনকে অস্বাভাবিক করে দিয়েছি? কোনো তদন্ত ছাড়াই কীভাবে সরকার সেই যুগ্মসচিবকে ওএসডি করে দিল?
জানি, অনেকে বলবেন, মাকে অভিযোগ করে যেতে হবে কেন? মা মরে সাত দিন ধরে পড়ে আছে, সন্তানরা কোনো খোঁজ নেয়নি—এতেই তো প্রমাণিত হয় সন্তানরা দোষী, তারা অমানুষ, তারা কুলাঙ্গার, তারা অমুক প্রাণির বাচ্চা, তমুক প্রাণির বাচ্ছা, তার শিক্ষিত নামধারী মূর্খ। অতএব কোনো যুক্তিতর্ক ছাড়াই তাদের শাস্তি দিয়ে দাও।
একটা গল্প বলি, শুনুন। কোনো এক গ্রামের এক মায়ের গল্প। সত্যি গল্প। সেই মায়ের ছিল দুই ছেলে ও এক মেয়ে। স্বামীর রেখে যাওয়া একটা বাড়ি ছিল তার। মৃত্যুর আগে স্বামী তার নামেই বাড়িটি লিখে দিয়ে গিয়েছিল। বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ছেলেরা থাকত। কিন্তু মা সারাক্ষণ পুত্রবধুদের সীমাহীন জ্বালাতন করত। মায়ের জ্বালাতনে অতিষ্ঠ হয়ে একদিন ছেলেরা আলাদা ঘর করতে চাইল। কিন্তু মা তার বাড়িতে আলাদা ঘর করতে দেবে না এবং পৈতৃক ঘরেও থাকতে দেবে না।
বাধ্য হেয়ে ছেলেরা স্ত্রী-সন্তান নিয়ে উপজেলা সদরে বাসা ভাড়া নিয়ে চলে গেল। মেয়েটি ভাইদের পক্ষ নিয়েছিল। সেই অপরাধে তাকেও বাড়িতে আসতে বারণ করে দিল মা। কিন্তু মা বলে কথা। বেহায়ার মতো মেয়েটি মাকে মাঝেমধ্যে দেখতে আসত। সে এলে মা খুব বিরক্ত হতো, তার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলতো না। ছেলেরাও মাঝেমধ্যে মায়ের টানে মাকে দেখতে আসত। তারা এলেই মা বাড়ি থেকে বেরিয়ে অন্য বাড়িতে চলে যেত। কারণ, তার মনে সবসময় এই ভয় কাজ করত যে, তার ছেলে ও মেয়ে মিলে তার বাড়িটা তাদের নামে লিখে নেবে। এই কারণে সে সন্তানদের সহ্য করতে পারত না। একদিন সন্তানরা বিরক্ত হয়ে বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দিল।
এখানে কার দোষ দেবেন? মায়ের, নাকি সন্তানদের? উত্তর আপনাদের কাছেই।
আমি বলছি না মিরপুরের মৃত মা গল্পের মায়ের মতো ছিলেন। বলছি না তার সন্তানরা নির্দোষ। কিন্তু একটি পরিবারে অনেক কিছু ঘটে, যা বাইরের কেউ জানতে পারে না। সমাজ মা বলতেই অজ্ঞান—এটা আমাদের সামাজিক রীতি। কিন্তু মা-ও যে মানুষ, মায়ের দ্বারাও যে অন্যায় কিছু ঘটতে পারে, তা সমাজ কখনোই দেখে না। পৃথিবীতে এমন মা-ও আছে, যে কিনা সদ্যজাত সন্তানকে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে যায়। এমন মা-ও আছে, যে কিনা সন্তানকে রেখে প্রেমিকের সঙ্গে চলে যায়। এমন বাবাও আছে, যে কিনা শিশুসন্তানকে লঞ্চে রেখে চলে যায়। ‘মা কর্তৃক সন্তান হ-ত্যা’ লিখে গুগলে সার্চ দিন—দেখবেন কতগুলো নিউজের লিংক আসে। সুতরাং মাকে আমি ন্যায়-অন্যায়ের উর্ধে রেখে দায়মুক্তি দিতে নারাজ।
মিরপুরে সেই প্রয়াত মায়ের চার সন্তান। সবাই প্রতিষ্ঠিত। চার সন্তানের মধ্যে একজন খারাপ হতে পারে, দুই জন খারাপ হতে পারে, তিনজনও খারাপ হতে পারে। কিন্তু চারজনই খারাপ—এই গণমত নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে।
ঘটনার আড়ালে ঘটনা থাকে। শুরুতে যা বলেছি, আমরা যা দেখি সবসময় তা সত্য হয় না। মিরপুরের ঘটনার আড়ালের ঘটনা কী, তা বের করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তা বের না করে মৃত মায়ের সন্তানদের বিরুদ্ধে কোনো রূপ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা রাষ্ট্র নিতে পারে না। নেওয়াটা অনুচিত।
আর আমরা ফেসবুকবাসীরা তো যা ইচ্ছা তা করতে পারি। আমরা বিচার-বিচেনা ছাড়াই যে কাউকে নায়ক কিংবা খলনায়ক বানিয়ে দিতে পারি। কারণ মত প্রকাশ আমাদের অধিকার। অন্যের সর্বনাশ ঘটে গেলেও আমরা সেই অধিকারের চর্চা করে যাবই।
আপনার মতামত লিখুন :